Breaking News
Home / স্থানীয় সংবাদ / বিধিনিষেধ মানছে না কেউ, চরম শঙ্কায় খুলনা

বিধিনিষেধ মানছে না কেউ, চরম শঙ্কায় খুলনা

গত ১৬ মাসে ১০ জেলায় শনাক্ত ৩৮ হাজার ৯০ : মৃত্যু ৬৯৫
শনাক্ত ও মৃত্যু দুটোই খুলনাতে বেশি : শনাক্ত ১১১০১, মৃত্যু ১৯২

কামরুল হোসেন মনি
মহানগরীর মহল্লার দোকান ও রাস্তাঘাটে মাস্কের ব্যবহার এবং সামাজিক দুরত্ব মেনে চলার অনীহা সবচেয়ে বেশি। মাস্ক ছাড়াই নিজ এলাকায় চলাচল করছে সাধারণ মানুষ। এলাকার দোকানগুলোতে একজনের সঙ্গে আরেকজন গা ঘেঁষেই কিনছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। বাজার এবং গণপরিবহনে যেন স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। অনেকের মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মানায় উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টম দেশে ছড়িয়ে পড়ার খবরেও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে মানুষ সর্তক হচ্ছে না। যে যার মতো চলছে। অনেকের মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মানায় উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিধিনিষেধ মানাতে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে বলে মনে করেন সচেতন ব্যক্তিরা।
এদিকে খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় চুয়াডাঙ্গায় গত বছরের ১৯ মার্চ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে বৃহস্পতিবার সকাল (১৬ মাসে) পর্য়ন্ত বিভাগের ১০ জেলায় শনাক্ত হয়েছে ৩৮ হাজার ৯৪ জন। মারা গেছে ৬৯৫ জন। এর মধ্যে খুলনা জেলায় শনাক্তের সংখ্যা ১১ হাজার ১০১ জন এবং মৃত্যু ১৯২ জন।
নগরীতে ঘুরে দেখা গেছে, মহল্লার দোকান এবং রাস্তঘাটে মাস্কের ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার অনীহা সবচেয়ে বেশি। মাস্ক ছাড়াই নিজ এলাকায় চলাচল করছে সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকেরই মুখেই নেই মাস্ক। কঠোর লকডাউন তুলে দেওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে চালু হয়- ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস ক্যাম্পেইন। প্রতিটি শপিং মল, দোকান, ব্যাংক ও অফিসের নোটিশ বোর্ডে ও দর্শনীয় স্থানে এ কথা লিখে টানিয়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে সেটি পালন করতে হবে। কেউ মাস্ক না পরে এলে, তাকে কোনো সেবা দেওয়া হবে না। দোকান মালিক সমিতিও ঘোষণা দিয়েছিলÑ মাস্ক ছাড়া দোকানে ক্রেতা প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। দোকানের বাইরে ‘নো মাস্ক নো এন্ট্রি’ লেখা থাকলেও বাস্তবে তা উল্টো।
এদিকে গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই। তাদের কোনো নির্দেশনাই পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। গত ২৩ মে দূরপাল্লার বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পর বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করে বাস মালিক সমিতি। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে মাস্ক ছাড়া কোনো যাত্রী গাড়িতে ওঠানো যাবে না। চালক, সুপারভাইজার, হেলপার এবং টিকিট বিক্রিতে নিয়োজিতরাও মাস্ক পরবেন। তাদের হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত সাবান-পানি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী বহন করার পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাত্রীদের কাছ থেকে বর্তমান ভাড়ার অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ ভাড়া আদায় করা যাবে। যাত্রার শুরু ও শেষে গাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাসহ জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। কিন্ত পরিবহনগুলোয় এসব নির্দেশনার কিছুই পালন করতে দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) খুলনা শাখা সভাপিত ডা: সেখ বাহারুল আলম বলেন, বিধিনিষেধ না মানলে সামনে আরও ভয়াবহ দিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতাও কম। সব জায়গায়ই একই অবস্থায় লক্ষ্য করা গেছে। অনেক পুলিশকেও দেখেছি, তারাই নিজেরাই মাস্ক না পড়ে সড়কে ডিউটি করছেন। শুধু কঠোর লকডাউন দিলেই তো চলবে না। যারা দিন আনে দিন খায় তাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা করতে হবে, কর্মহীন মানুষদের কে নিয়েও ভাবতে হবে। যার পেটে ক্ষুধা আছে, সে লকডাউন কেনো, কারফিউ দিলেও মানবে না। বর্তমানে যে বিধিনিষেধ জারি রয়েছে, তাতে করোনা সংক্রমনরোধে বিন্দুমাত্র কাজে আসবে না। যেসব জেলায় সংক্রমণের হার উচ্চ পর্যায় রয়েছে, ওই সব এলাকায় কঠোর লকডাউন দিতে হবে। অন্য জেলাগুলো থেকে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। তা না হলে বিপদ হয়ে যাবে। করোনা থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সবাইকে বাধ্য করতে হবে। তিনি বলেন, গত বছরের চেয়ে বতর্মানে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। হাসপাতালে করোনা ইউনিটে বেড খালি নেই। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক কম, যার কারণে সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছে। করোনা আর ২য় ইউনিট চালু করতে পারছে না জনবল সংকটের কারণে। এভাবে চিকিৎসা সেবা চলতে পারে না।
খুলনা মহানগর জাসদের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো: খালিদ হোসেন বলেন, করোনা বিস্তার নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষের মাঝে প্রচার-প্রচারনা করে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আগের মতোই কঠোর হতে হবে পুলিশ-প্রশাসনকে। ম্যাজিস্ট্রে নিয়োগ দিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। ইজিবাইক, মটরসাইকেলসহ ছোটখাট যানবাহনে যারা চলাচল করছেন অধিকাংশই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে যেসব মোড়ে সার্জেন্টরা দায়িত্বরত আছেন, প্রয়োজন হলে এসব সার্জেন্টদের মাধ্যমে জরিমানা করতে হবে। এছাড়া পাড়া মহল্লায় আগে ১০-১২ জন পুলিশের টিম এলাকায় টহল দিতো তাদেরকেও আরও কঠোর হতে হবে। তা না হলে বিধিনিষেধ প্রচার প্রচারনা করেই কোন লাভ হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খুলনা বিভাগ পরিচালক (স্বাস্থ্য) এর অধিদপ্তরের সূত্র মতে, ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় করোনা সংক্রমিত হয়েছে ৩৮ হাজার ৯০ জন। এ সময়ে মারা যায় ৬৯৫ জন। এর মধ্যে খুলনা জেলায় শনাক্ত হয় ১১ হাজার ১০১ জন, মৃত্যু হয় ১৯২ জন। যা অন্যান্য জেলার চেয়ে শনাক্ত ও মৃত্যু দিক থেকেও বেশি। এছাড়া বাগেরহাট জেলায় শনাক্ত ১ হাজার ৯৯১, মৃত্যু ৫৩, চুয়াডাঙ্গা জেলায় শনাক্ত ২ হাজার ১৫৪ জন, মৃত্যু ৬৪ জন, যশোর জেলায় শনাক্ত ৭ হাজার ৮৯৯, মৃত্যু ৮৪ জন, ঝিনাইদহ জেলায় ৩ হাজার ৩১ জন, মৃত্যু ৫৭ জন, কুষ্টিয়া জেলায় শনাক্ত ৫ হাজার ৩৯৪ , মৃত্যু ১২৪ জন, মাগুরা জেলায় ১ হাজার ২৯২, মৃত্যু ২৩, মেহেরপুরে জেলায় ১ হাজার ১১০ জন, মৃত্যু ২৩ জন, নড়াইল জেলায় শনাক্ত ১ হাজার ৯৬১ , মৃত্যু ২৭ এবং সাতক্ষীরা জেলায় শনাক্ত ২ হাজার ১৫৭ জন এবং মৃত্যু হয় ৪৮ জন।
এদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে এবার রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসকরা। ধারণ ক্ষমতার ২৫ ভাগ বেশি রোগী এরই মধ্যে ভর্তি হয়েছে এ হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে ১২৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। ফলে এখানে চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে করোনা ইউনিট-২ চালু করার প্রস্তুতি নিলে জনবল না পাওয়া তা চালু করতে পারছে না হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও করোনা ওয়ার্ডের ফোকাল পার্সন ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, খুলনা করোনা হাসপাতালে বর্তমানে ১২৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে রেডজোনে ৫৫ জন এবং ইয়োলোজোনে ২৯ জন, এইচডিইউতে ৩০ জন, সিসিইউতে ১২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় রোগী ভর্তি হয়েছেন ৪৯ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৩ জন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা আক্রান্ত হয়ে দুই জন এবং একজন উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার আরও জানান, হাসপাতালে তরল অক্সিজেনের মজুত দ্বিগুণ করা হয়েছে। করোনা হাসপাতালের পুরোটাই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থায় চলছে। হাসপাতালে ২৪টা হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে। আইসিইউ শয্যা আগে ১০টা ছিল। ৩০ মে থেকে শয্যা ২০টা করা হয়েছে। এর সঙ্গে ১০ শয্যার এইচডিইউ চালু করা হয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*