Breaking News
Home / জাতীয় সংবাদ / মডেল মসজিদের মাধ্যমে মানুষ ইসলামের মর্মবাণী বুঝবে: প্রধানমন্ত্রী

মডেল মসজিদের মাধ্যমে মানুষ ইসলামের মর্মবাণী বুঝবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রবাহ রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ইসলাম ধর্ম হচ্ছে সবচেয়ে সহনশীল ধর্ম। যে ধর্ম মানুষের অধিকার দেয়, মানুষকে মানুষ হিসেবে তৈরি করার শিক্ষা দেয়। সেই শিক্ষাটা যেন সবাই পায় সেটা আমরা চাই। আমি আশা করি আমাদের মডেল মসজিদের মাধ্যমে ইসলামের বাণী প্রচার হবে, ইসলামের সংস্কৃতির প্রচার হবে, ইসলামের মর্মবাণী সকলে, সকল ধর্মের মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে। সেদিকে খেয়াল রেখে এটা আমাদের করা। গতকাল বৃহস্পতিবার সারাদেশে ৫৬০টি মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের ৫০টি মসজিদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের অনেক খেদমত করে গেছেন। তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবং তিনিই ইসলামিক ফাউন্ডেশনটা তৈরি করে গিয়েছিলেন। ইসলামের প্রচার-প্রসারে বাংলাদেশও যেন ভবিষ্যতে অবদান রাখতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে প্রথম পর্যায়ে নির্মিত ৫০টি মসজিদের উদ্বোধন করছি। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমরা লেবাসসর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। তিনি বলেন, আমরা মুসলিম অধ্যুষিত দেশ, এই ইসলামের চর্চা এবং মূল্যবোধের চর্চা যেন ভালোভাবে হয়, ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ যেন হয়, ইসলামের মর্মবাণীটা যেন মানুষ ভালোভাবে বুঝতে পারে সেটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। আমরা দেখেছি ধর্মের নাম দিয়ে কীভাবে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা শুধু আমাদের দেশে না, বিশ্বব্যাপী দেখিছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মের নামে মানুষ খুন করা, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করা এবং মানুষকে খুন করলে নাকি বেহেশতে চলে যাবে; আমার প্রশ্ন যারা এ পর্যন্ত খুন-খারাপি করেছে তারা কে কে বেহেশতে গেছে সেটা কি কেউ বলতে পারবে? কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু সবথেকে সর্বনাশ করে গেছে পবিত্র ইসলাম ধর্মের, যে ধর্ম শান্তির ধর্ম, যে ধর্ম মানুষকে অধিকার দিয়ে গেছে। আমি মনে করি সারাবিশ্বে সব থেকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম হচ্ছে ইসলাম ধর্ম। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো এই মুষ্টিমেয় লোক জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে, মানুষ হত্যা করে, বোমা মেরে, খুন-খারাপি করে আমাদের এই পবিত্র ধর্মের নামে বদনাম সৃষ্টি করছে। এটা আমাদের ধর্মের পবিত্রতা শুধু নষ্ট করছে না, ইমেজটাও নষ্ট হচ্ছে সারাবিশ্বে। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসের সঙ্গে যারা জড়িত ওলামা, অভিভাবক, শিক্ষক সকলকে অনুরোধ জানাব- এই পথ সর্বনাশা পথ, এটি হতে সকলে যেন দূরে থাকে সে জন্য সকলকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ধর্মের চর্চা করতে হলে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, মানুষের কল্যাণ করতে হবে, মানুষের সেবা করতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের অকল্যাণ করে, মানুষ হত্যা করে, একটা পরিবারকে ধ্বংস করে বেহেশতে যেতে পারবে না। এটা ভুল কথা। মডেল মসজিদ, এই মসজিদের মাধ্যমে আমাদের ইসলাম, আমাদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দাওয়াতি কার্যক্রম সেগুলো যেন সঠিকভাবে প্রচার-প্রসার, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, এগুলো থেকে মানুষ যেন দূরে থাকে। তিনি বলেন, বরং মানুষ যেন আমাদের ধর্মের যে মূলকথা সেটা যেন মানুষ সঠিকভাবে শিখতে পারে, জানতে পারে। ধর্মের চর্চা করার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষ যেন জানতে পারে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সবদিকে আমাদের ব্যাপ্তি সারাবিশ্বে। সবকিছুতেই তো মুসলমানরা আগে এগিয়ে এসেছে। সবসময় মুসলমানরাই সামনে ছিল। সভ্যতার দিক থেকে মুসলমানরা সবসময় আগে ছিল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে শুরু করে মুসলমানরা সবসময় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসাশাস্ত্রে, জোত্যির্বিদ্যা- সবকিছুতেই মুসলমানরা এগিয়ে ছিল। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে- বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে। আজ কেন মুসলমানরা পিছিয়ে থাকবে। সেটিই আমার প্রশ্ন। সরকারপ্রধান বলেন, আমরা এই মসজিদগুলো পেয়েছি, আমরা এটাই চাচ্ছি- প্রতিটি জেলা-উপজেলায়। আমরা চাই যে আমাদের পবিত্র ধর্ম সম্পর্কে মানুষ সচেতন হবে। এই মসজিদগুলোতে সে ব্যবস্থা রয়েছে। আপনাদের এই দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যেন ধর্মীয় দৃষ্টিতে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারীর প্রতি সহিংসতা, মাদক, মাদকের হাত থেকে মানুষ যেন মুক্ত হতে পারে তার জন্য সকলকে আরও সচেতন হতে হবে। এসবের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এই মসজিদকে আমরা সেইভাবে তৈরি করেছি। তিনি বলেন, ইসলাম সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যাতে বৃদ্ধি পায় সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা মসজিদগুলো করেছি। আজ আমি সত্যিই খুব আনন্দিত, মডেল মসজিদগুলো হতে ইসলামের সঠিক মর্মবাণী প্রচার হবে, ইসলামের সঠিক জ্ঞানচর্চা হবে, মুসলমানরা আরও সচেতন হবে, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় এগিয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ধর্ম মন্ত্রণালয় কতৃর্ক আয়োজিত এ-সংক্রান্ত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি উন্নত মসজিদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার সারাদেশে ৮ হাজার ৭শ’ ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিশে^ এ ধরনের প্রকল্প নজিরবিহীন। পদ্মা বহুমুখী সেতুর পর নিজস্ব অর্থায়নে এটা সরকারের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রকল্প। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এই যৌথ উদ্যোগকে বাস্তাবায়িত করেছে সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তর। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো.ফরিদুল হক খান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বে করেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নুরুল ইসলাম স্বাগত বক্তৃতা করেন। গণভবন থেকে মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াসহ পিএমও এবং গণভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইসলাম প্রচারের পথিকৃৎ’ শীর্ষক একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়। সরকার প্রধান অনুষ্ঠান থেকে খুলনা জেলা মডেল মসজিদ, রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেরা মডেল মসজিদ এবং সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলা মডেল মসজিদের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। এ প্রকল্পের আওতায় জেলা সদর ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে ৪ তলা এবং উপজেলা ও উপকূলীয় এলাকায় ৩ তলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। মূল মসজিদটি হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। মহিলাদের জন্য পৃথক নামাজ কক্ষের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মুসল্লিদের নামাজ কক্ষে সহজে প্রবেশের সুবিধার্থে র‌্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ৪ তলা বিশিষ্ট প্রতিটি মসজিদে একসঙ্গে ১২০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। অপর দিকে, ৩ তলা মডেল মসজিদগুলোতে একত্রে ৯০০ জন মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া মসজিদে কুরআন চর্চার জন্য হিফজখানা, হজযাত্রী ও ইমামদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মুসল্লিদের জ্ঞান আহরণের জন্য মসজিদে নববীর আদলে ইসলামিক লাইব্রেরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মসজিদ কমপ্লেক্স এর মধ্যে পৃথক ভবনে ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে থাকবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অফিস, কনফারেন্স হল, গবেষণা কক্ষ, প্রতিবন্ধী কর্নার, হজযাত্রীদের প্রাকনিবন্ধন ও দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আবাসনের ব্যবস্থা ইত্যাদি। মডেল মসজিদ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) শফিক তালুকদার গত বুধবার সাভার উপজেলা মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে এই প্রকল্পে মসজিদ গুলোর অবস্থান এবং নির্মান শৈলী এবং সরকারের ব্যয়ের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। এই কর্মকর্তা বলেন, দেশে যুগান্তকারী ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫০টির মতো মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরো ১০০টি মডেল মসজিদ উদ্বোধন করা হবে। তিনি জানান, বিশ্বে এই প্রথম কোন সরকার একসাথে এই বিপুল সংখ্যক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলামি মূল্যবোধ ও মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের প্রচারণার পাশাপাশি জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের মূল বাণী প্রচার করাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। যে ৫০টি মডেল মসজিদ নির্মিত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- ঢাকার সাভার উপজেলায়, ফরিদপুরের মধুখালী ও সালথা উপজেলায়, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ও কুলিয়ারচর উপজেলায়, মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায়, রাজবাড়ি সদর উপজেলায়, শরিয়তপুর সদর ও গোসাইরহাট উপজেলায়, বগুড়ার শারিয়াকান্দি, শেরপুর ও কাহালু উপজেলায়, নওগাঁর সাপাহার ও পরশা উপজেলায় সিরাজগঞ্জ জেলা ও সদর উপজেলায়, পাবনার চাটমোহর উপজেলায়, রাজশাহীর গোদাগারি ও পাবা উপজেলায়, দিনাজপুরের খানসামা ও বিরোল উপজেলায়, লালমণিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায়, পঞ্চগড় সদর ও দেবীগঞ্জ উপজেলায়, রংপুর জেলা, সদর উপজেলা, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলায়, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায়, নোয়াখালির সুবর্ণচর উপজেলায়, ময়মনসিংহের গফরগাও ও তারাকা উপজেলায়, চট্টগ্রাম জেলার লোহাগড়া, মীরসরাইর ও সন্দ্বীপ উপজেলায়, জামালপুর সদর ও ইসলামপুর উপজেলায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর ও বিজয়নগর উপজেলায়, ভোলা সদর, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায়, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায়, খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায়, কুষ্টিয়া সদর, খুলনা জেলা, চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়, ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায়।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*