Breaking News
Home / স্থানীয় সংবাদ / খুলনায় ঔষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের দৌরত্ম

খুলনায় ঔষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের দৌরত্ম

ক্ষুন্ন হচ্ছে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা

মোঃ আশিকুর রহমান ঃ খুলনা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোসহ বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে ভোর হতে না হতে মারাত্বক শারিরীক অসুস্থার জন্য ভীড় করেছেন খুলনা সরকারি হাসপাতাল গুলোতে টিকিটের লম্বা লাইনে। মারাত্বক শারিরীক অসুস্থার শিকার মুমূর্ষ রেীগারা শহরসহ প্রত্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল হতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, খুলনা সদর জেনারেল হাসপাতাল, খুলনা শিশু হাসপাতালের জরুরী বিভাগ বর্হিবিভাগে অর্থপেডিক্স, মেডিসিন, গাইনি, চর্ম ও যৌন, কার্ডিওলজী, গ্যাস্ট্রেলজী, নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জেরি, ইউরোলজী, দন্ত, চক্ষু, নাক-কান গলা, সার্জেরী সহ প্রভৃতি বিভাগে রোগীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সহ ডাক্তার দেখাতে আসেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ডাক্তারী কার্যক্রম শেষে চিকিৎসক কোন কোম্পানী ওষুধ লিখেছে, রোগী চিকিৎসকের কক্ষ হতে বেড়েনো মাত্র হাসপাতাল সম্মুখে ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাটানি আর ছবি তোলার পর্ব যেন শেষ হয়না, এদের এমন যন্ত্রনাদায়ক আচারণে ক্ষুব্ধ রোগী সহ স্বজনরা। একই সাথে শহরের বিভিন্ন বে-সরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা চিকিৎসকের ব্যাক্তিগন চেম্বারে তাদের এই কার্যক্রম অব্যহত আছে, যা চরম যন্ত্রনা আর বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে রোগী আর তার স্বজনদের নিকট। দিনে সরকারি-বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোতে একক বিচরন আর সন্ধ্যার পর হতে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে বা শহরের নামিদামি ওষুধের মার্কেট বা বিপণীতে গুলোতে দেখা যায় সারিবদ্ধ ভীড়।
সরেজমিনে, নগরীর হেরাজ মার্কেট, শিশু হাসপাতাল সম্মুখ ফার্মেসী, শান্তিধাম ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল সম্মুখ, গল্লামারী, গগনবাবু রোড, সিটি মেডিকেল কলেজ সম্মুখ, খুলনা স্যার্জিকাল মেডিকেল কলেজ, ২৫০ শয্যা হাসপাতাল সম্মুখ ফার্মেসী, বয়রা, দৌলতপুর, বৈকালি আদ্বদীন হাসপাতাল সম্মুখ, খালিশপুর, ফুলবাড়ী, শিরোমনি, ফুলতলা সহ বিভিন্ন এলাকায় চলে তাদের এ কার্যকম।
বিভিন্ন হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরী বিভাগসহ ভিতরের প্রতিটি ওয়ার্ড, চিকিৎসকদের রুমে অবাধে চলছে বিভিন্ন কোম্পানির ঔষধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের প্রচার-প্রচারনার কার্যক্রম। এতে যেমন ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রম তেমনি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তার স্বজনদের। এদের প্রতি চিকিৎসক, নার্স, স্টাফরাও অতিষ্ঠ। এসব ঔষধ কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধিরা মানছেননা হাসপাতালে ভিজিটের কোনো নিয়ম কানুন । বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে এমনই দৃশ্য দেখা গেছে।
কেবলমাত্র শহরের মধ্যে নয় বরং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতেও বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানি প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য দিন দিনই বেড়েই চলেছে। নিজেদের কোম্পানির ঔষধ লেখা আছে কিনা তা দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তারা। তাদের দৌরাত্ম্যে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন রোগীরা। যদিও সূত্রে জানা যায়, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কোন ঔষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির দেখা করা নিষেধ। এ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানছেনা কেউ? রোগীরা বের হলেই ব্যবস্থাপত্র নিয়ে করা হচ্ছে টানাহেচড়া এতে রোগীরা অস্বস্তি ও বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ছেন। বিষয়টি পুরুষদের জন্য স্বাভাবিক হলেও নারীদের জন্য খুবই বিব্রতকর। ক্ষুন্ন হচ্ছে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা।
আবু নাসের হাসপাতালে বর্হিবিভাগে বুকে ব্যাথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন হামিদুল (৫৫)। তিনি এসেছেন ডুমুরিয়া হতে। ডাক্তার রুম হতে ফটক সম্মুখে থাকা প্রতিনিধি দল একের পর এক প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে টানা হেচড়া শুরু করেছেন। কেউ আবার ছবিও তুলছেন।
এই হাসপাতালে আর্থপেডিক্স বিভাগ ডাক্তার দেখাতে এসেছেন শারমিন আক্তার। তার অবস্থা একই। অবশেষে তিনি বললেন, সরেন আমি অনেক ব্যস্ত, আপনাদের সবাইকে আমার দেখানোর সময় নেই।
খুলনা শিশু হাসপাতালে বর্হিবিভাগে নদীর ওপার সেনের বাজার হতে হতে মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে এসেছেন নাসিমা সুলতানা। মেয়েকে নিয়ে বাইরে আসতেই তাকে ঘীরে ধরেছে অনেকেই। কোন কোম্পানী সিরাপ লেখেছে তা দেখতে যেন মরিয়া এসব কোম্পানীর প্রতিনিধিরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, মাকেটিংয়ের চাকুরী, তাই টার্গেট থাকে। টার্গেট পূরন না হলে এ.এম, আরএম এর বেশি কথার মাপ পাওয়া যায় না। একই সাথে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কাটা পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে এমন বেশি তথারকি করতে হয়। যদিও মানবিক দৃষ্টিতে রোগীকে বিরক্ত করা ঠিক না। অভিযোগ রয়েছে, বড় ধরণের অফার ছাড়াও প্রতিনিয়ত উপহার হিসাবে কলম, নোট প্যাড, টিস্যু, সহ অনেক আকর্ষণীয় উপহার সামগ্রী, ঔষধের স্যামপল প্যাক প্রদান করা হয়ে থাকে চিকিৎসকদের, যার দরুন তাদের এর অবাদ বিচরণ চলে সর্বক্ষন জুড়ে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নগর শাখার সাঃ সম্পাদক এ্যাড. কুদরত-ই-খুদা জানান, এই অনৈতিক চর্চার কারণে রোগীর কোনো লাভ হচ্ছে না। উল্টো ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের চাপে থাকছেন চিকিৎসকরা। তাই আমাদের একত্র হয়ে এ কাজ বন্ধ করতে হবে।
এ ব্যাপারে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ এস এম মোর্শেদ জানান, ইতিমধ্যে ঔষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের বিষয়ে ইতিমধ্যে একটি মিটিং সম্পন্ন হয়েছে। মিটিংয়ে তাদের ব্যাপারে সিধান্ত নেয়া হয়েছে। যা নোটিশ কারণে বর্হিবিভাগ সহ হাসপাতালের সর্বত্র প্রদান করা হবে। শুধুমাত্র সপ্তাহে দুইদিন শনি ও মঙ্গলবার ডাক্তার ভিজিট করতে পারবেন। দুপুর ১ হতে আড়াইটা পর্যন্ত। বাকি দিন হাসপাতাল চত্ত্বরে চিকিৎসা সেবা বা আত্মীয়-স্বজনের জন্য আসতে পারবেন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*