স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম যেন থামছেনা : সাড়াশি অভিযান শুরু

র‌্যাবের অভিযানে দুই ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টারকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা, অবৈধভাবে কত প্রতিষ্ঠান চলছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে তথ্য নেই

কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, অনুমোদনহীন ল্যাব পরিচালনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অপারেশন পরিচালনার জন্য র‌্যাবের পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত কর্তৃক দুটি প্রতিষ্ঠানকে অর্থদ- প্রদান করেছে র‌্যাব-৬। গতকাল বুধবার র‌্যাব-৬ এর স্পেশাল কোম্পানীর একটি দল নগরীর হরিণটানা থানাধীন মোহাম্মদপুর এলাকায় ছফুরা ক্লিনিক ও মোহাম্মদনগন হসপিটাল এ- ডায়াগণস্টিক সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ছফুরা ক্লিনিক ও মোহাম্মাদনগর হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। র‌্যাব-৬ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, নগরীর হরিণটানা থানাধীন মোহাম্মাদনগর এলাকায় ছফুরা ক্লিনিক ও মোহাম্মাদনগর হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, অনুমোদনবিহীন ল্যাব পরিচালনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অপারেশন পরিচালনা করে আসছে। এমন সংবাদের ভিত্তিতে উক্ত দলটি সহকারী কমিশনার স্থানীয় সরকার শাখা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, খুলনা এর সহযোগীতায় উক্ত দুটি প্রতিষ্ঠানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এ সময় ছফুরা ক্লিনিক এর মালিক আনোয়ার হোসেনের পুত্র মো: জিয়াউর রহমান (৩৩) কে চিকিৎসা ব্যবস্থা অনিয়ম করায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৫৩ মোতাবেক এক লাখ টাকা এবং মোহাম্মমদনগর হসপিটাল এ- ডায়াগণস্টিক সেন্টারের মালিক নুরুল আলম মোল্লার মেয়ে মিসেস নুরুননাহার (৪১) কে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করেন। অভিযানে খুলনা সিভিল সার্জন প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেডিকেল অফিসার ডা: শেখ সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা। এদিকে খুলনা মহানগন ও উপজেলাগুলোতে অসংখ্য অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার প্রশাসনের নজর এড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলনা সিটিতে ও উপজেলায় পর্যায়ে বেশি। উপজেলাগুলোতে অবৈধভাবে কত প্রতিষ্ঠান চলছে খুলনা সিভিল সার্জন এসব বিষয়ে তেমন কিছুই জানেন না। সরকারের দপ্তরটির কাছে এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্যও নেই। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি না থাকায় এই অরাজকতা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা: সামন্ত লাল সেন স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ব্যাপারে ছাড় না দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এসব অননুমোদিত ও লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের সব বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের তথ্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূত্রটি বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো সেবাদানের নামে প্রায়ই ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগীদের মৃত্যুঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খুলনা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ৯ উপজেলাগুলোতে নিবন্ধিত ক্লিনিক এর সংখ্যা আছে ৫৬ টি এবং ডায়াগণস্টিক সেন্টার আছে ৮৬টি। এছাড়া খুলনা সিটিতে নিবন্ধিত ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার আছে ২৩৯টি। এর মধ্যে ডায়াগণস্টিক সেন্টার আছে ১৪০টি। খুলনা উপজেলাগুলোতে কতগুলো অনিবন্ধিত ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার রয়েছে এমন প্রশ্নে খুলনা সিভিল সার্জন ডা: সবিজুর রহমান বলেন, নিবন্ধনের বাইরে কত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এ সব তথ্যর জন্য উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে মাঠ পর্যায়ে জরিপ করে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। সিভিল সার্জন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সাত কর্মদিবসের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের তথ্য দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই ভাবে আমরা কাজ করছি। সিভিল সার্জন বলেন, শুধু আবেদনের ওপর ভিত্তি করেই বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগণস্টিক সেন্টার পরিচালনা করা আইনগতভাবে এটা সম্পুর্ণ অবৈধ। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৮২ সালের মেডিক্যাল অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু বৈধ-অবৈধ অনেক হাসপাতালে প্রায়ই ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৫ মে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সারা দেশে অনুমোদিত এবং অনুমোদনহীন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠাতে বিভাগীয় পরিচালকদের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিভাগীয় কার্যালয়গুলোর পাঠানো তথ্য নিয়ে লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একটি তালিকা তৈরি করে অধিদপ্তর। ওই সময় চিকিৎসার নামে প্রতারণা ব্যবসা রুখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলো খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিদিনই খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ও উপজেলায় অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা জোরদার করেছিলেন। ওই সময় (২০২২ সালের মে মাসের শেষের দিকে) গত তিন দিনে এই অভিযানে খুলনা বিভাগে অবৈধ ২০৪টি ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন নগরীতে অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিভিল সার্জন সমন্বয়ে একটি টিম। ওই অভিযানে ১২টি ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে ৮টি ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার বন্ধ ঘোষনা করা হয়। এর মধ্যে ক্লিনিক ছিলো তিনটি। অধিকাংশই এই সব অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার ছিলো খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের বিপরীতে। অভিযানের যাওয়ার আগেই অধিকাংশই অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টারগুলো নিজেরাই তালাবদ্ধ করে রেখে প্রতিষ্ঠান থেকে সটকে পড়েন। ওই সময়ে সাউথ সিটি ডায়াগণস্টিক এন্ড কনস্যালটেশন সেন্টারটিও তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় দেখা যায়। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিপ্তরের পরিচালক ডা: মো মনজুরুল মুরশিদ তখন বলেছিলেন, খুলনা বিভাগে তিন দিনের অভিযানে ২০৪টি ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার বন্ধ ঘোষনা করা হয়। এর মধ্যে ডায়াগণস্টিক সেন্টার ৭২ টি ও ক্লিনিক ছিলো ১৩২ টি । তিনি বলেন, অনিবন্ধিত ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টারেরর বিরুদ্ধে তাদের এ অভিযান চলমান থাকবে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে, এ অভিযান ঝিমিয়ে পড়ার পর কিছু দিন যেতে না যেতেই কিছু অসাধু ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টারের ব্যবসায়ীরা অদৃশ্য কারণে পুনরায় চালু করেন তাদের ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার।
এ ব্যাপারে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিপ্তরের পরিচালক ডা: মো মনজুরুল মুরশিদকে তার ব্যবহৃত মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৈধ সনদ, নিয়মিত নবায়ন, নারকোটিক পারমিট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), পরিবেশ ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (ক্ষতিকর ও অক্ষতিকর) কাগজপত্র সত্যায়িত করে সংরক্ষণ করতে হবে, যা পরিদর্শনকালে নিরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ সেবার ক্ষেত্রে প্রতিটির শয্যা সংখ্যা, সেবা প্রদানকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কর্তব্যরত চিকিৎসকের নাম ও কর্তব্যরত নার্সদের নাম-ঠিকানা, ছবি, বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন, বিশেষজ্ঞ সনদ, নিয়োগ ও যোগদান বা সম্মতিপত্র লাগবে। চিকিৎসা সাহায্যকারীদের তালিকা, যন্ত্রপাতির তালিকা, বর্তমানে যেসব অস্ত্রোপচার ও যন্ত্রপাতির তালিকা হাসপাতাল প্রধানের স্বাক্ষরসহ সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু কোনো হাসপাতালেই এসব শর্ত শতভাগ মানা হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button