নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতির চুক্তি চূড়ান্ত করতে বললেন বাইডেন

নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করলে যুক্তরাজ্য কোন আপত্তি করবে না
গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে ট্রাম্পের জোরালো আহবান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমালা হ্যারিস বললেন আমি আর চুপ থাকবো না, যুদ্ধ এখনই বন্ধ করুন
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের মধ্যে বৈঠকটি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি চূড়ান্ত করতে নেতানিয়াহুকে আহ্বান জানিয়েছেন বাইডেন। এ ব্যাপারে বিবৃতিতে তারা বলেছে, “আপনি এদিকে আর ঘোরাঘুরি না করে সোজা দেশে ফিরে যেয়ে দ্রুত হামাসের সাথে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করেন। আমার প্রার্থী জনপ্রিয় কামালা হ্যারিস গাজায় আগ্রাসন একেবারেই মেনে নেননি। তিনি ক্ষিপ্ত আপনাদের প্রতি। ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও শুনলাম আপনাকে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ফিলিস্তিনে নিরপরাধ নারী-শিশু হত্যা মেনে নেয়নি। কাজে কাজেই এখানকার আর কোন সাপোর্ট আপনি পাবেন না। সামনে নির্বাচন এখন সবাই জনগণের ম্যান্ডেট চায়। প্রেসিডেন্ট বাইডেন পার্থক্যগুলো দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা, যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি চূড়ান্ত করা, জিম্মিদের মুক্তি এবং যুদ্ধ বন্ধের কথা বলেছেন। এছাড়া তাদের মধ্যে গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এবং ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যাপারেও কথা হয়েছে।” ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও দখলদার ইসরায়েলের মধ্যে ১০ মাস ধরে যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও এক লাখেরও বেশি মানুষ। আহত ও নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিসের সঙ্গে দেখা করেন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া নেতানিয়াহু সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও বৈঠকে মিলিত হন। নেতানিয়াহু দেখা করার আগে ট্রাম্প জানান তিনি চান গাজার যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হোক। অপরদিকে ইসরায়েল নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের, চাপে নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ সেদেশের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিতে আপত্তি তুলে নিয়েছে যুক্তরাজ্য। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে দেশটির নীতি ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিল ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি, যা ইসরায়েল বিষয়ে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ দেশটির। এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ব্যাপারে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে উপেক্ষা করেও এই পদক্ষেপ নিয়েছে ব্রিটেনের লেবার পার্টি সরকার। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট শুক্রবার জানায়, আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আদালতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন। এ বিষয়ে ওই আদালতের এখতিয়ার নিয়ে যুক্তরাজ্যের সরকার কোনও চ্যালেঞ্জ জানাবে না। যুক্তরাজ্যের এ পদক্ষেপে এখন করিম খানের আবেদন আইসিসির গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আরও বেশি সম্ভাবনা তৈরি হল। আদালত এ আবেদন গ্রহণ করলে তা হবে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে বড় তিরস্কারের ঘটনা। সেই সঙ্গে দেশের বাইরে ভ্রমণে গ্রেফতার হওয়ার ঝুঁকিতেও পড়বেন নেতানিয়াহু। যুক্তরাজ্যের ওই সিদ্ধান্ত ইসরায়েল নিয়ে দেশটির গত কয়েক মাস ধরে গ্রহণ করে চলা নীতির একেবারে বিপরীত। কেননা, আগের কনজারভেটিভ সরকার দেশটির প্রতি তার সমর্থনের ব্যাপারে ছিল অনমনীয়; যা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেরই অনুরূপ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাজ্যের নতুন সরকারের মন্ত্রীরা ইসরায়েলকে নিয়ে নতুন আরও কিছু সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার মধ্যে থাকবে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক আইন কতটুকু প্রতিপালন করছে সে বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অনুরোধে শুরু হওয়া পর্যালোচনার ফলাফলও। ইতোমধ্যে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলে কিছু অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করার কথা বিবেচনা করছেন তিনি। অপদিকে গাজা ইস্যুতে সুর বদল, চুপ থাকবেন না কমলা হ্যারিস বর্তমান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস বলেছেন, ইসরায়েলি যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনিরা যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সে বিষয়ে তিনি চুপ থাকবেন না। আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া কমলার এই কথাকে অনেকেই মুসলিম ভোটারদের সন্তুষ্ট করার পন্থা হিসেবেই দেখছেন। যদিও মার্কিন অধিকারকর্মীরা বলছেন, কমলার কাছ থেকে শুধু সহানুভূতিমূলক কথা শুনতে চান না। তারা চান নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি। কমলা হ্যারিস বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এরপর তিনি টেলিভিশন ভাষণে বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর (নেতানিয়াহু) কাছে গাজায় অনেক নিরপরাধ বেসামরিক লোকের মৃত্যুসহ মানবিক দুর্ভোগের মাত্রা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।’ এই যুদ্ধকে তিনি বিপর্যয়কর বলেও আখ্যা দিয়েছেন। কমলা আরও বলেন, “মৃত শিশু এবং মরিয়া, ক্ষুধার্ত মানুষদের সুরক্ষার জন্য পালিয়ে যাওয়ার চিত্র আমরা মেনে নিতে পারি না। তাদের অনেকেই বহুবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আমরা এই ট্র্যাজেডিগুলির মুখোমুখি হতে পারি না। আমরা নিজেদেরকে কষ্টের কাছে অসাড় হতে দিতে পারি না এবং আমি চুপ থাকব না।’ তবে একই মুখে ইসরায়েলের জন্য অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন কমলা। মার্কিন অধিকারকর্মীরা বলছেন, গত অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে বাইডেন সরকার। এই কারণে অনেক ভোটার ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতিতে অর্থপূর্ণ পরিবর্তন না করে শুধু শুধু মুখে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি দেখালে কমলা হ্যারিস ভোটার টানতে পারবেন না। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ইমান আবদেলহাদি বলেছেন, গাজার শিশুদের হত্যা বন্ধ করার প্রকৃত প্রতিশ্রুতি ছাড়া তাদের প্রতি তার (কমলা) সহানুভূতি নিয়ে আমি খুব একটা উদ্বেলিত না। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার দায় যুক্তরাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। তিনি বলেন, মাথায় গুলি করছেন এমন কারও প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার বিষয়টি ঠিক প্রশংসনীয় নয়। আমাদের এসব মানুষের সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। তাদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, যেগুলো সক্রিয়ভাবে মানুষ হত্যা করছে।


