বাবাকে খবর দিতে বলে মারা যান গুলিবিদ্ধ শাওন

প্রবাহ রিপোর্ট : কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গত ২০ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন মারা যান কসমেটিকস দোকানের কর্মচারী মো. ইউনুছ আলী শাওন (১৭)। পরে আন্দোলকারীদের একজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আহত শাওন তার পকেটে থাকা ব্যাটন মোবাইলটি দেখিয়ে বলেন, ‘আব্বু নামে আমার বাবার মোবাইল নম্বরটি সেভ করা আছে। আমার খবরটি তাকে বাবাকে জানিয়ে দিন’। পরে শাওনের কথামতো তার বাবাকে ফোন করে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরটি জানানো হয়। ছেলের মোবাইল থেকে কল পেয়ে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে রিসিভ করেন শাওনের বাবা আবুল বাশার। কিন্তু ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরে যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে তার মাথায়। চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। পরে সবাই ছুটে এসে ওই মোবাইল নম্বরে ফোন করে জানতে পারেন শাওন আর নেই। কিশোর শাওনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের দক্ষিণ মাগুরী গ্রামের আবুল বাশারের ছেলে। পরিবারের সদস্যরা জানায়, শাওন ঢাকার শনির আখড়া এলাকার একটি কসমেটিকস দোকানের কর্মচারী ছিলেন। পরিবারের হাল ধরতে ঘর ছেড়ে রাজধানীতে পাড়ি জমান শাওন। প্রতিদিনের ন্যায় ঘটনার দিন দুপুরে শাওন দোকান বন্ধ করে খাবার খেতে বাসায় যাচ্ছিলেন। দোকানের বাইরে আসার পরপরই দুটি গুলি এসে শাওনের বুকে ও পেটে বিদ্ধ হয়। বুকের গুলিটি শরীর বেদ করে বেরিয়ে যায়। শাওন লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। একসময় গুলিবর্ষণ বন্ধ হলে উপস্থিত লোকজন এসে শাওনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে। ২০ জুলাই শাওনের মৃত্যু হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শাওনের ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন ২১ জুলাই লাশ বুঝে পায় পরিবারের লোকজন। পরে ২২ জুলাই রোববার সকালে জানাজা শেষে পারিবারি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানা যায়, শাওনের বাবা আবুল বশার একজন হতদরিদ্র কৃষক। তার দ্বিতীয় স্ত্রী কুলছুমের ঘরে জন্ম শাওনের। আবুল বাশারের প্রথম স্ত্রী দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে মারা যান। প্রথম ঘরের বড় ছেলে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন তিনি। স্বল্প বেতন হওয়ায় পরিবার চালাতেই কষ্ট হয় তার। আরেক ছেলে মানসিক রোগী। তার ওষুধ কিনতেই লাগে অনেক অর্থ। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। আবুল বাশারের ঘরটা ছাড়া সহায়-সম্বল বলতে তেমন আর কিছু নেই। গ্রামের রাস্তার দুইপাশে সবজি চাষ করে ও অন্যের একখ- জমি বর্গা চাষাবাদ করেন তিনি। শাওনের পাঠানো অর্থ দিয়েই চলত তাদের সংসার। স্থানীয়রা জানায়, কয়েক বছর আগেও শাওনদের বসতঘরও ছিল না। গ্রামের লোকজনের সহযোগিতায় একটি টিনশেড ঘর তৈরি করা হয়। অভাব-অনটন যেন এ পরিবারটির নিত্য সঙ্গী। তারা আরও জানায়, অভাবের কারণে শাওনের লেখাপড়া করা হয়নি। গ্রামের একটি মাদ্রাসা থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর ফুফাতো বোনের জামাইয়ের সঙ্গে চলে যান ঢাকায়। রাজধানীর শনির আখড়া এলাকায় কসমেটিক্স দোকানে সেলসম্যানের চাকরি নেয় শাওন। থাকা এবং খাওয়া ওই আত্মীয়ের বাসায়। মাসিক বেতন ছিল পাঁচ হাজার। বেতনের টাকাই ছিল তার পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। কিশোর ছেলে রোজগার করে সংসারের হাল ধরেছেন, সেই ছেলেকে হারিয়ে বাবা আবুল বাশার এখন শোকাহত। কিশোর ছেলেটি একদিন বড় হবে, সংসারের দুঃখ ঘোচাবে, সে আশায় ছিল আবুল বাশার। ছেলের কবরের পাশে গিয়ে আবুল বাশার বিলাপ করে বলেন, ওরে আমার বুকের মানিককে কেড়ে নিলোরে? আমি কি করে বাঁচুমরে? আমার ছেলের কি অপরাধ ছিলোরে? তোরা আমার মানিকরে ফিরিয়ে দেরে, আমার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে রে। একমাত্র ছেলে শাওন নিহত হওয়ার পর থেকেই নির্বাক হয়ে গেছেন কুলছুম বেগম। কারও সঙ্গেই তেমন কথাবার্তা বলছেন না। নিয়মিত খাবারও গ্রহণ করেন না তিনি। কান্না করছেন আর নামাজের বিছানায় বসে ছেলের জন্য দোয়া করছেন। গ্রামের লোকজন জানান, শাওন শান্ত স্বভাবের ছেলে। তার বাবা কোনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। নিজেদের কর্ম নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকতেন। শাওনের অকাল মৃত্যুতে পুরো গ্রামের শোক নেমে এসেছে।



