স্থানীয় সংবাদ

আলো ছড়াচ্ছে মণিরামপুরের খামারবাড়ী পাবলিক লাইব্রেরি

মোঃ আব্বাস উদ্দীন, মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি ঃ লাইব্রেরিতে অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলিত হয়ে আছে নানা ধরনের পুস্তকের মাধ্যমে। লাইব্রেরি জ্ঞান ধারার মহামিলন ক্ষেত্র। লাইব্রেরি মানুষের জ্ঞানের পিপাসা মেটায়-আনন্দ দান করে। সভ্যতার বিকাশে লাইব্রেরির কোন বিকল্প নেই। যেখানে লাইব্রেরি গড়ে উঠেছে সেখানকার মানুষের কৃষ্টি-সভ্যতা, আচার-আচারনের উন্নতি সাধিত হয়েছে। যুগের চাহিদায় নগর সভ্যতা বিকাশে নির্মিত প্রসিদ্ধ সব লাইব্রেরি সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত আছি। কিন্তু গ্রামীণ জনপদে গড়ে উঠা এমন সব লাইব্রেরির ইতিকথা কারণে অকারণে প্রচারনা পায়নি। এমনই গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা যশোরের মণিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী খামারবাড়ী পাবলিক লাইব্রেরি নিয়ে লেখনিটি পাঠক সমীপে তুলে ধরা হলো। শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর অপরাহ্নে চলতি পথের যাত্রায় বাড়ী থেকে মোটরবাইক যোগে সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পূর্বে মণিরামপুর উপজেলার খানপুর খামারবাড়ী স্কুল মাঠে পৌছালাম। হরিহরনদীর তীরে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত স্কুল প্রাঙ্গণে রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ। এই মাঠের উত্তর-পূর্ব কোনে হরিহরনদীর কোল ঘেষে অত্যান্ত নিরিবিলি পরিবেশে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে খামারবাড়ী পাবলিক লাইব্রেরি। এগিয়ে যেতেই দেখলাম পাঠকপ্রিয় এই লাইব্রেরিতে কিছু পাঠক সমাগম। উৎসুক মনে লাইব্রেরির ভিতরে প্রবেশ করে কিছু খুদে পাঠককে দেখে এই লাইব্রেরি সম্পর্কে জানার আগ্রহ হলো। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে মানুষটি এই লাইব্রেরিকে আগলে রেখেছেন স্বপ্রনোদিত হয়ে একান্ত নিরবে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে এর দেখভাল করে যাচ্ছেন সেই মানুষটি জনাব জমিরুল ইসলামকে দেখা গেল খুদে ৪ পাঠককের মাঝে বই বিতরণের রেজিষ্টার খাতা লিখছেন। লাইব্রেরি নিয়ে কথা হয় তাঁর সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, এলাকার শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক এমন কয়েক বিশিষ্টজন আব্দুস সাত্তার মোড়ল, শামছুর রহমান,মতিয়ার রহমান খান, বীরমুক্তিযোদ্ধা আকতার হোসেন খান, লৌলত হোসেন খান, ফজলুর রহমান মোড়লসহ কিছু ব্যক্তির উদ্যোগে ১৯৬৬ সালে খামারবাড়ি পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই লাইব্রেরির জীবন সদস্য ৮৩ জন আর সাধারন সদস্য ২২০ জন। চাচের বেড়া ও গোল পাতার ছাউনির ঘর নির্মাণ করে এর যাত্রা শুরু হয়। যা পরবর্ত্তীতে ইটের গাথনি ও টিনসেডের ঘর হয়। এখন ছাদের ঘর ও সুন্দর পরিবেশে লাইব্রেরির কার্যক্রম সুচারুভাবে চলছে। লাইব্রেরির সংগ্রহে রয়েছে ২ হাজার ৩৫৮ টি হরেক রকমের বই। এই বিশাল গ্রন্থশালার বই রাখার জন্য ৪টা আলমারি ও ৪টা র‌্যাক রয়েছে। বই পড়ার জন্য বড় পরিসরের তিনটা টেবিল ও ২০ খানা চেয়ার রয়েছে। লাইব্রেরি ভবনটি বেশ পরিপাটির। ঘরের মেঝেতে বসানো হয়েছে আকর্ষনীয় টাইলস। মুক্তিযুদ্ধ কর্নারসহ এই লাইব্রেরিতে মুক্তিযুদ্ধের দলিল, রবীন্দ্র রচনাবলী,নজরুল রচনাবলী,শরৎ রচনাবলী,বঙ্কিম রচনাবলী, ইসলামী বিশ^কোষ, বিশ^নবীর জীবন ও আদর্শ,সৈয়দ গোলাম মোস্তফা, ডাঃ লুৎফর রহমান, শার্লক হোমস,জীবনানন্দ দাসের রচনা সমগ্র,মনিষীদের জীবনী, আল-হাদিস ও আল-কোরআনের তরজামাসহ বিভিন্ন লেখকের উপন্যাস, কবিতা,গল্প, রম্যরচনা,খেলার বইসহ নানা ধরনের বই পাঠকদের জন্য সংগ্রহে রয়েছে জানালেন লাইব্রেরির তত্বাবধায়ক জমিরুল ইসলাম। লাইব্রেরিতে আগত খুদে পাঠকদের মধ্যে খামারবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী মুর্শিদা আক্তার মুন ও মরিয়ম আক্তার তিশা বলেন, তারা নিয়মিত পাঠক হিসেবে লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়ার পর জমা দিয়ে আর একটি নতুন বই নিয়ে পড়ে থাকে। এদিন তারা দুজনে হাসান হাফিজের দশ দেশের রূপ কথা ও রকিব হাসানের তুষার দানো বই সংগ্রহ করেন। অন্য আর এক পাঠক আবুল কালাম আজাদ মিলন জানান, গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা খামারবাড়ী পাবলিক লাইব্রেরি দেশের অন্য যে কোন লাইব্রেরির সমতুল্য বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই পাড়া গাঁয়ের লাইব্রেরিতে বহুবিধ বই রয়েছে। আমি এই লাইব্রেরি থেকে নিয়মিতভাবে হরেক রকমের বই নিয়ে পড়ে উপকৃত হচ্ছি। খামারবাড়ি পাবলিক লাইব্রেরির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মতিয়ার রহমান খান বলেন, উপজেলা পর্যায়ে এটি বেশ পুরনো, প্রসিদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী পাবলিক লাইব্রেরি । যা প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এলাকার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও কৃষ্টি- সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। পাঠক প্রিয় করার জন্য লাইব্রেরির শ্রী বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাঝে মাঝে পাঠচক্র ও নানামুখী প্রতিভা বিকাশে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই লাইব্রেরিটি আরও প্রসিদ্ধ হবে এবং এই জনপদের মানুষ উন্নত সমাজ ও উন্নত জাতি গঠনে নেতৃত্ব পাবে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button