মেডিকেল ও কিচেন বর্জ্য একসাথে ডাম্পিং করায় ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নগরবাসী

# স্বাদিচ্ছার বিরুদ্ধে বর্জ্য সংগ্রহে নানা অভিযোগ #
খলিলুর রহমান সুমন ঃ মেডিকেল ও কিচেন বর্জ্য ডাম্পিং করা নিয়ে স্বাদিচ্ছা মানব কল্যাণ সংস্থার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিদিন একবার করে মেডিকেল ও কিচেন বর্জ্য নেয়ার কথা থাকলেও তারা তা নেয় না। তারা সপ্তাহে ২/৩ দিন এসব বর্জ্য নিয়ে থাকে বলে ক্লিনিক ও হাসপাতাল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। একই সাথে মেডিকেল ও কিচেন বর্জ্য সংগ্রহ করে তা ডাম্পিং করে নগরবাসীকে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। এতে করে তারা স্বাদিচ্ছার সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেসিসির সাথে সর্বশেষ এ সংস্থার চুক্তি হয় ১ ফেব্রুয়ারী’২৪। এক বছরের জন্য এ চুক্তিনামা হয়। চুক্তি নবায়নের আগে এ সংস্থা প্রতি বছরই সেবারমান বাড়ানোর ওয়াদা করলেও মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান। কেসিসির এষ্টেট অফিসার (সাবেক সহকারী কনজারভেন্সী অফিসার ১-৫নং ওয়ার্ড) গাজী সালাউদ্দীন বলেন, নগরবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ স্বাদিচ্ছার সেবারমান সঠিক আছে কি না তা নিয়ে তদন্ত করার নির্দেশনা দেন। সে মতে, তিনি তদন্ত করে প্রতিবেদন পেশ করেন। ওই প্রতিবেদনে স্বাদিচ্ছার সেবারমান যে খুবই খারাপ তা তিনি উল্লেখ করেন। একই সাথে ওই সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্তকরণের সুপারিশ করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখলে স্বাদিচ্ছার মত সংস্থা কখনই বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেত না। কিন্তু সেবারমান না বাড়িয়ে প্রতিবেদন ধামাচাপা দিতে স্বাদিচ্ছা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে ওই সময়। ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী কেসিসির এক আলোচনা সভায় স্বাদিচ্ছার কাজ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ তোলেন। ওই সভায় কনজারভেন্সী অফিসার আনিসুর রহমান বলেন, মেডিকেল বর্জ্য ডাম্পিং করার পাশাপাশি স্বাদিচ্ছা মানব কল্যাণ সংস্থা খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এসটিএস’ এ মেডিকেল বর্জ্য ডাম্পিং করে। যার কারণে পরিবেশের পাশাপাশি আমাদের কর্মীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কেসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থায়ী কমিটি সাবেক সভাপতি এসএম খুরশিদ আহম্মেদ ওই সময় জানান, স্বাদিচ্ছা মানব কল্যাণ সংস্থা খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ১-১৬ নং ওয়ার্ডের মেডিকেল ওয়েস্ট সংগ্রহ ও প্লান্টে অপসারণের জন্য কাজ করছে। কিন্তু তাদের কাজের গুনগতমান সন্তোষজনক নয়, পাশাপাশি তারা যত্রতত্র মেডিকেল বর্জ্য ডাম্পিং করার ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ওই সভায় সাবেক মেয়র স্বাদিচ্ছাকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, তাদের নামে প্রচুর অভিযোগ তাঁর কাছে আছে এবং বিষয়টি তিনি অবগত। এ ব্যাপারে তাদেরকে আরো আন্তরিকতার সহিত সেবার কাজটি করতে হবে। জনগন যাতে তাদের সেবার জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে না পড়ে সেদিকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। ওই সভায় স্বাদিচ্ছা মানব কল্যাণ সংস্থা’কে আগামী ছয় মাস সময় বেঁধে দেন সাবেক মেয়র। এই ৬ মাসের মধ্যে কাজের গুনগত মান যদি সন্তোষজনক না হয়ে তাহলে তাদের চুক্তি বাতিল করা হবে। সেক্ষেত্রে অন্য প্রতিষ্ঠানকে খুলনা “খ” অঞ্চলের মেডিকেল বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব প্রদান করা হবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে স্বাদিচ্ছা তার সেবারমান না বাড়ালেও অদৃশ্য কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। একটি সূত্র জানায়, ওই কঠোর সিদ্ধান্ত হওয়ার পর স্বাদিচ্ছা সেবার মান না বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের মান বাড়িয়েছিল। দৌলতপুর পিরামিড ক্লিনিকের ম্যানেজার মুজিবর রহমান জানান, তাদের ক্লিনিক থেকে সপ্তাহে ২/৩ দিন বর্জ্য নিয়ে থাকে। মহেশ্বরপাশা মানিকতলার সূর্য্যরে হাসি ক্লিনিকের এডমিন কামাল হোসেন জানান, সপ্তাহে ১/২ দিন বর্জ্য নেয় স্বাদিচ্ছা। খালিশপুর ক্লিনিকের প্রতিনিধি আমজাদ জানান, মাঝে অনেক সমস্যা ছিল। তবে এখন এক দিন পর এক দিন বর্জ্য নেয়। খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার কালিপদ রাহা বলেন, সাদিচ্ছা হাসপাতাল থেকে এক দিন পর একদিন বর্জ্য সংগ্রহ করেন। মেডিকেল বর্জ্য তারা নেয় আর কিচেন বর্জ্য কেসিসি নেয়। তবে কেসিসির কনজারভেন্সী অফিসার মোঃ আনিসুর রহমান বিষয়টি অবগত নন বলে তিনি জানান। আদ্ব দীন হাসপাতালের এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মোঃ হোসাইন আলী জানান, স্বাদিচ্ছা নিয়মিত বর্জ্য নেয়। তবে তারা সব বর্জ্যই এক সাথে নেয়। তাদের সেবারমান আরো একটু ভাল করা উচিত। তিনি জানান, আগে প্রদীপন হাসপাতাল থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করতো। কেন যে তাদের বাদ দিল তা জানতে পারিনি। স্বাদিচ্ছার সেবার এ চিত্র প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। তদারকি সঠিকভাবে না করার কারণে তারা ঠিকভাবে সেবা না দিয়েও বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আঃ আজিজ বলেন, স্বাদিচ্ছা ও প্রদীপনের সেবারমান নিয়ে কোন ত্রুটি আছে কি না তা নিয়ে আজ মঙ্গলবার সভা আহবান করা হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৩টায় কেসিসি সচিব শরীফ আসিফ রহমান এ সভা ডেকেছেন। তারা নগরীর মেডিকেল ও কিচেন বর্জ্য সংগ্রহ করে থাকে। এ সেবারমান নিয়ে কোন অভিযোগ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা এবং সেবারমান বাড়াতে এ সভার আহবান করা হয়েছে বলে তিনি জানান। স্বাদিচ্ছা মালিক জীবন কুমার কর বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। কোন কোন ক্লিনিক থেকে প্রতিদিন আবার কোনটা থেকে একদিন পর একদিন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। তাদেরকে আলাদা করে বর্জ্য দেয়ার ব্যাপারে তাগিদ দেয়া সত্বেও তারা মেডিকেল ও কিচেন বর্জ্য একসাথে দিচ্ছে। যার জন্য সংস্থা ইচ্ছা থাকা সত্বেও বর্জ্য আলাদা সংগ্রহ করতে পারছে না। এতে করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তো থাকছেই। প্রকৃত পক্ষে যেভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করার দরকার সেভাবে সংগ্রহ করতে পারছি না। সার্ভিস চার্জ খুবই কম দিচ্ছে। লোকসান দিয়েই এ সেবা দিয়ে চলেছি বলে তিনি দাবি করেন। কেসিসির সচিব শরীফ আসিফ রহমান জানান, বিষয়টি তিনি খোঁজ খবর নিয়ে অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বস্ত করেন। খুলনা পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি নাগরিক নেতা এড. কুদরত ই খুদা বলেন, বর্জ্য তিনভাবে ভাগ করা থাকবে। যা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আলাদা বক্স থাকতে হবে। সে অনুযায়ী তারা বর্জ্য সংগ্রহ করবে। প্লাস্টিক ও মেডিকেল বর্জ্য কখনই ডাম্পিং করা যাবে না। এ বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলতে হবে। সংশ্লিস্ট সংস্থা মেডিকেল ও কিচের বর্জ্য এক সাথে সংগ্রহ করে ডাম্পিং করে নগরবাসিকে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে। বিষয়টি কেসিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সঠিকভাবে তদারকি করবে। স্পর্শ কাতর এ বর্জ্য সংগ্রহ ও বিনস্ট করতে কোন ধরনের দায়িত্ব অবহেলা করলে তা কঠোর হস্তে দমন করা উচিত বলে এই নাগরিক নেতা মনে করেন।



