রাফাল, মিগসহ ভারতের ৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি পাকিস্তানের

# পাকিস্তানে নিহত ২৬, ভারতে ১৫ জন মোট ৪১জন
# মসজিদে সরাসরি ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাত মেনে নেবেনা মুসলিম সমাজ
# অপারেশন সিঁদুর নাম দিয়ে হিন্দুত্ববাদ জাগ্রত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ভারত
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ কাশ্মীরে হামলা নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে পাকিস্তানের ছয়টি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ভারত। এসব হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত এবং ৭০ জন আহত হয়েছেন। এর জবাবে রাতেই পাল্টা হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা হামলায় অংশ নেওয়া ভারতের পাঁচটি জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করেছে। কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেডের সদর দপ্তর ও তল্লাশিচৌকিও গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে তারা। ভারতের সেনাবাহিনী বলেছে, কাশ্মীরে পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া গোলার আঘাতে তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ভারতে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ১৫জন। ভারতের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ আখ্যায়িত করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এর সমুচিত জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের হামলাকে ‘হতাশাজনক’ বলেছেন। শিগগির এই সংকটের সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। সংঘাতপূর্ণ এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বিশ্ব নিতে পারবে না বলে সতর্ক করেছেন তিনি। উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। ভারত প্রতিবেশী দেশটিতে এই হামলা চালিয়েছে গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার জেরে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাশ্মীরে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সে কারণে তাদের এই হামলা চালাতে হয়েছে।
ভারত এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় গতকাল দিবাগত রাত একটার পর। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নাম দিয়ে এই অভিযান চালিয়েছে ভারতীয় বাহিনী। এর আওতায় পাকিস্তান ও পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের নয়টি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। পাকিস্তানের ছয় স্থানÍপাঞ্জাবের শিয়ালকোট, ভাওয়ালপুর ও মুরিদকে এবং পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফ্ফারাবাদ, বাগ ও কোটলি শহরে একের পর এক ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ভারতের সেনাবাহিনী বলেছে, তারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কোনো স্থাপনায় হামলা চালায়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম পিটিআই জানিয়েছে, ভাওয়ালপুরে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী জইশ–ই–মোহাম্মদের প্রধান কার্যালয় , মুরিদকে শহরে পাকিস্তানভিত্তিক আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী লস্কর–ই–তাইয়েবার প্রধান কার্যালয়সহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আস্তানায় এসব হামলা চালিয়েছে। কাশ্মীরে হামলার পর দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট ওরফে কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স নামের একটি গোষ্ঠী ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল। যদিও পরে তারা তা অস্বীকার করে। ধারণা করা হয়, এই গোষ্ঠীর সঙ্গে লস্কর-ই-তাইয়েবার সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর প্রথম প্রকাশ করেন পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী। রাত একটার পর পাকিস্তানের এআরউয়াই নিউজকে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে কিছু সময় আগে কাপুরুষ শত্রু ভারত ভাওয়ালপুরের আহমেদ ইস্ট এলাকার সুবহান্নাল্লাহ মসজিদ, কোটলি ও মুজাফ্ফরবাদের অন্তত তিন জায়গায় বিমান হামলা চালিয়েছে।’ পরে অন্য এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হওয়ার কথা জানায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের আকাশসীমা থেকে নিক্ষেপ করা হয় বলে পাকিস্তানের আইএসপিআরের মহাপরিচালক জানান। তখনই তিনি বলেন, ভারতের এই হামলার জবাব দেওয়া হচ্ছে। এরপর এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘কোনো উসকানি ছাড়া ভারতের এই হামলার সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার পাকিস্তানের আছে এবং উপযুক্ত জবাব দেওয়া হচ্ছে।’
এর কিছুক্ষণ পর রাত পৌনে তিনটার দিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, দ্রুত পাল্টা হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের দুটি জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করেছে। এর ঘণ্টাখানেক পর ভারতের তৃতীয় জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করার খবর দেয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পিটিভি। বলা হয়, ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অবন্তিপুরার ১৭ নটিক্যাল দক্ষিণ–পশ্চিমে ভারতের আরেকটি রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী। এর মধ্যে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম জিও নিউজ জানায়, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় ধুনদিয়াল সেক্টরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেডের সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
ভোর চারটার দিকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮ জন নিহত, ৩৫ জন আহত এবং ২ জন নিখোঁজ হওয়ার কথা জানায়। এর এক ঘণ্টা পরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও তথ্যমন্ত্রী ভারতের চতুর্থ ও পঞ্চম জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করার কথা জানান। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ভূপাতিত করা পাঁচটি ভারতীয় জঙ্গি বিমানের মধ্যে তিনটি রাফাল, একটি রাশিয়ান এসইউ–৩০ ও আরেকটি মিগ-২৯ জঙ্গি বিমান। অপরদিকে ভারতের তিনটি রাফাল, একটি মিগ-২৯ এবং একটি সু-৩০, একটি অত্যাধুনিক ড্রোনসহ ৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার দাবি করেছে পাকিস্তান। এছাড়া ভারতের একটি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ধ্বংস করার দাবি করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের সঙ্গে বুধবার (৭ এপ্রিল) এ তথ্য জানান তিনি। এছাড়া কয়েকজন ভারতীয় সেনাকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকের দাবিও করেছেন তিনি। খাজা আসিফ জানিয়েছেন, যদি ভারত আগ্রাসী মনোভাব বাদ দেয় তাহলে তারা তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। কিন্তু ভারত যদি আগ্রাসী কিছু করে তাহলে তারা অবশ্যই জবাব দেবেন। খাজা আসিফ বলেন, “যদি এসব শত্রুতাপূর্ণ কর্মকা- বন্ধ হয়, আমরা অবশ্যই ভারতের সঙ্গে কথা বলব। আমরা চাই না এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হোক। কিন্তু ভারত থেকে যদি শত্রুতাপূর্ণ কিছু আসে, তাহলে আমাদের জবাব দিতে হবে।” যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার পাশাপাশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড সদরদপ্তরে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। মঙ্গলবার মধ্যরাতে পাকিস্তানের একাধিক জায়গায় মিসাইল ছোড়ে ভারত। এর জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালানো শুরু করে ইসলামাবাদ। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র সরকারি টিভি চ্যানেল পিটিভিকে জানিয়েছেন, ভারতীয় সেনাদের ব্রিগেড সদরদপ্তরে হামলা চালিয়ে এটি ধ্বংস করা হয়েছে।
এছাড়া সীমান্ত রেখার (এলওসি) দুদনিয়াল সেক্টরে মিসাইল ছুড়ে ভারতীয় সেনাদের একটি চৌকি ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। এসবের সঙ্গে একটি ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি। প্রথমে তিনটি যুদ্ধবিমান ধ্বংসের কথা শোনা গেলেও দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এখন পাঁচটি বিমান ভূপাতিতের কথা জানাচ্ছেন। গত ২২ এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের পেহেলগামে বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়ে ২৬ জনকে হত্যা করে। এ ঘটনায় ভারত পাকিস্তানকে দোষারোপ করার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। যা মঙ্গলবার রাতে চূড়ান্তরূপ ধারণ করে।
এদিকে ভারতের মিসাইল হামলায় এখন পর্যন্ত ৪১ জন নিহত ও ৭০জন আহত হয়েছেন। দেশটির ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক আহমেদ শরীফ চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।



