মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-াদেশ খালাস পেয়ে মুক্ত আজহার বললেন- ‘এখন স্বাধীন’

প্রবাহ রিপোর্ট : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদ-াদেশ খালাস পেয়ে অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম। গতকাল বুধবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে ভর্তিরত অবস্থায় কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে তাকে হাসপাতাল থেকে একটি কালো রঙের গাড়িতে করে হাসপাতাল থেকে বের করে আনা হয়। সেখান থেকে এটিএম আজহারুল ইসলামকে শাহবাগ চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জামায়াতের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৪ বছর কারাভোগের পর বেরিয়ে এসে গতকাল বুধবার সকালে শাহবাগ চত্বরে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মাধ্যমে যাদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে, বিচারের নামে তাদের ‘হত্যা করা’ হয়েছে দাবি করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, এই হত্যাকা-ের সঙ্গে যারা যেখানে যে পর্যায়ে জড়িত। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক। তা নাহলে খারাপ সংস্কৃতি চালু থাকবে, এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদ-াদেশ থেকে খালাস পেয়ে সকাল ৯টা ৫ মিনিটে মুক্তি পান জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে ভর্তিরত অবস্থায় কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে তাকে হাসপাতাল থেকে একটি কালো রঙের গাড়িতে করে হাসপাতাল থেকে বের করে আনা হয়। এসময় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ দলটির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে এটিএম আজহারুল ইসলামকে শাহবাগ চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা মঞ্চে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এটিএম আজহার বলেন, আমি প্রায় ১৪ বছর কারাগারে থাকার পর আজ (গতকাল বুধবার) সকালে মুক্তি পেলাম। আমি এখন মুক্ত, আমি এখন স্বাধীন। এই স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিক এখন। মৃত্যুদ- থেকে খালাসের জন্য উচ্চ আদালতকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তারা (আদালত) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটা অনন্য ভূমিকা পালন করছেন। এতদিন ন্যায়বিচার ছিল না। আদালতকে ব্যবহার করা হয়েছে। আশা করছি, সামনের দিনগুলোতে জনগণ ন্যয়বিচার যেন পান, সেই ব্যবস্থাই তারা করবেন। তার মামলায় যেসব আইনজীবী লড়েছেন, তাদেরও ধন্যবাদ জানান এটিএম আজহার। পরে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে বিপ্লবের নায়কদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি। তাদের আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, ছাত্র সমাজই রাজপথে রক্ত ঢেলে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যার কারণে বাংলাদেশ নতুনভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছে। তিনি বলেন, যারা আমার নেতা ছিলেন, তাদের অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে, জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে। এসময় মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়া জামায়াতের শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মো. কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লাকে স্মরণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদিকে বিনাচিকিৎসায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে, গত মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে এটিএম আজহারকে মৃত্যুদ- থেকে খালাস দেন আপিল বিভাগ। সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় ঘোষণা করা হয়। এদিন রাতেই রায়ের অনুলিপি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পিজি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে কারা কর্তৃপক্ষ আজহারুল ইসলামের মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ঢাকা বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) মো. জাহাঙ্গীর কবির তার মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সকাল ৯টা ৫ মিনিটে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়া হয় আজহারুল ইসলামকে। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদ- এবং দুটি অভিযোগে কারাদ- দেন। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে একটি থেকে তিনি খালাস পেয়েছিলেন। যে অভিযোগগুলোয় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল আজহারুল ইসলাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং জামায়াত সদস্যদের সঙ্গে মিলে মোকসেদপুর গ্রামে আক্রমণ চালান। তারা বাড়িঘরে লুটপাট চালায়, অগ্নিসংযোগ করে এবং অসংখ্য নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় মৃত্যুদ-ে দ-িত হন আজহারুল। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল আজহারুল ইসলাম রংপুরের ঝাড়ুয়ারবিলের কাছে হিন্দু অধ্যুষিত একাধিক গ্রামে পরিকল্পিত হামলায় অংশ নেন। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং আরও ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের (জেসিই) অধীনে দোষী সাব্যস্ত হন আজহারুল। মৃত্যুদ- দেন আদালত। ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল আজহারুল ইসলাম রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে চারজন হিন্দু অধ্যাপক ও একজন অধ্যাপকের স্ত্রীকে অপহরণ করেন। পরে তাদের হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে রংপুর টাউন হলে বেশ কয়েকজনকে অপহরণ করে আটক রাখা হয়। যেটি ধর্ষণ ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অপহরণ, আটক, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং অন্যান্য অমানবিক কর্মকা-ের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ২৫ বছরের সশ্রম কারাদ-ে দ-িত করা হয়। ১৯৭১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে দুটি ঘটনায় আজহারুল ইসলাম এক যুবককে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার জন্য চড় দেন এবং পরে তার ভাইকে অপহরণ ও নির্যাতনের নির্দেশ দেন। নির্যাতনে ওই ব্যক্তি স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকার হন। এতে ৫ বছরের সশ্রম কারাদ-ের রায় দেন আদালত।



