দৌলতপুর মুহসিন মহিলা কলেজে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ

# নির্ধারিত সময়ের ৫ ঘন্টা পর পরীক্ষা শুরু
# ৭টি পদের বিপরীতে ৪৮ জন লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন
# পরীক্ষা বাতিলের দাবি অভিযোগকারীদের #
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনার দৌলতপুর মুহসিন মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষসহ ৮ জন কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পছন্দের লোক নিয়োগের লক্ষ্যে টোটাল নিয়োগ পরীক্ষা একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।সিন্ডিকেটের মধ্যে কলেজের দু’জন শিক্ষকও রয়েছেন বলে জানা যায়। কলেজের অধ্যক্ষ স্বাক্ষরিত আবেদনকারীদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্রে পরীক্ষার সময় সকাল সাড়ে ৯ ঘটিকা উল্লেখ থাকলেও পরীক্ষা শুরু হয় ৫ ঘন্টা বিলম্বে বেলা সাড়ে তিনটায়। হাতে লেখা প্রশ্নপত্রে শুক্রবার (১৩ জুন) লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন লিখিত পরীক্ষার উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয় রাত সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত। নিয়োগ ও নির্বাচনী পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী অনেকে। পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তা বাতিল এবং অনিয়মের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে রবিবার (১৫জুন) উপাধ্যক্ষ পদে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোঃ শফিকুল আলম, ল্যাব সহকারি(পদার্থবিজ্ঞান) পদের প্রার্থী হাদীউজ্জামান, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদের প্রার্থী তানভীর আহমেদ কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অধ্যক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কলেজ সূত্রে জানা যায়, উপাধ্যক্ষসহ মোট আটটি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। আটটি পদের বিপরীতে মোট ৭৩ জন চাকুরী প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে আইসিটি ল্যাব সহকারি পদে তিনজন আবেদন করলেও পরীক্ষার দিন একজন উপস্থিত হওয়ায় কোরাম সংকটের কারণে ওই পদের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। বাকী উপাধ্যক্ষ পদে ১১ জন, হিসাব সহকারি পদে ৫ জন, অফিস সহায়ক পদে ৯ জন,ল্যাব সহকারি (রসায়ন) পদে ৬ জন,ল্যাব সহকারি (জীব বিজ্ঞান) পদে ৬ জন, ল্যাব সহকারী (পদার্থ বিজ্ঞান) পদে ৫ জন, অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার পদে ৬ জন মোট ৭টি পদের বিপরীতে ৪৮ জন লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। বাকিরা অনুপস্থিত ছিলেন। উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পরীক্ষা অংশগ্রহণকারী মোঃ শফিকুল আলম কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন,পরীক্ষায় পক্ষপাতিত্ব,অনিয়ম করা হয়েছে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী এবং অত্র কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোঃ মাহফুজুর রহমান উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ লাভের জন্য ১৫ লাখ টাকা প্রদান করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তিনি খালিশপুর ন্যাশনাল স্কুলের ইনডেক্স নিয়ে কলেজে চাকরি করছেন। যা বিধি বহির্ভূত। অর্থ প্রদানের কারণে উক্ত প্রার্থীর পক্ষে ফলাফল প্রদানের চেষ্টা চলেছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। এ অবস্থায় উক্ত নিয়োগ ও নির্বাচনী পরীক্ষা বাতিল এবং অনিয়মের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।
সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ ছাড়াও তিনি বলেন,’পরীক্ষার হলে যেয়ে যা কিছু বুঝতে পেরেছি, যে সমস্ত ঘটনা গুঞ্জন উঠেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে এক্সপার্ট নিয়োগ করা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা নিয়োগ পরীক্ষায় কাজ করেছে, একটা সিন্ডিকেট মিলে ৭/৮ টা নিয়োগের বিষয়ে টোটাল কাজ হয়েছে। এ কাজের ভিতর তারা রাতের অন্ধকারে হোটেল সিটি ইনসহ এ সমস্ত জায়গায় যে সকল কর্মকর্তারা এসেছিলেন তাদের সাথে টোটাল লেনদেন হয়েছে। এবং অর্থনৈতিক লেনদেন হওয়ার পরে তারা রাতের অন্ধকারে পার্টিদের সাথে সমস্ত আলোচনা করেছে, আর দিনের অন্ধকারে সেটা স্বচ্ছ করার জন্য জাস্ট কলেজে এসে প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং সেই ভাবে পরীক্ষা নিয়ে একটা প্রহসনের পরীক্ষা করেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওই কলেজের আইসিটি শিক্ষক মিঃ মাহফুজ সাহেবকে ভাইস প্রিন্সিপাল নিয়োগ করতে চেয়েছে। মিঃ মাহফুজ সাহেব স্কুলের নিবন্ধন দিয়ে ওই কলেজে চাকরি করতে এসেছেন। কিন্তু স্কুল এবং কলেজের নিবন্ধন সম্পূর্ণ আলাদা। অডিটে ধরা পড়ে তার বেতন বন্ধ হয়। তার মানে তিনি একজন করাপ্টেড পার্সোনালিটি। তার উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ নেই। একজন করাপ্টেড পার্সোনালিটি যদি প্রশাসনে অবস্থান করে তাহলে সেই কলেজের প্রশাসনিক অবস্থা কি হবে’? তার এই অভিযোগ সম্পর্কে কলেজের আইসিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাফুজার রহমান বলেন, ‘২০০৫ সালে আমার বিরুদ্ধে ইনডেক্স একটা অভিযোগ আনা হয়। সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে আমি হাইকোর্টে রিট করি। হাইকোর্ট আমার সেই ইনডেক্সটাকে বহাল রেখে রায় দেয়। এবং আমার চাকরিতে স্বপদে বহাল রেখেছে। তার বিরুদ্ধে আপিল হয়েছিল আপিলেও আমি জয়লাভ করি। অতএব সেটা হাইকোর্টে সেটেলড হয়ে গেছে। মামলার রিট হয় ২০০৫ সালে আর মামলার ফয়সালা হয় ২০০৮ সালে’।
ল্যাব সহকারী (পদার্থ বিজ্ঞান) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী হাদীউজ্জামান কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল সাড়ে ৯ টায় কিন্তু অজ্ঞাত কারণবশত বেলা সাড়ে তিনটায় উক্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যা প্রায় রাত ১১ ঘটিকা পর্যন্ত চলে। উক্ত সময়ের মধ্যে আমার কাছে চাকুরি পাওয়াইয়া দেওয়া বাবদ টাকা দাবি করেন। আমি অপারগতা স্বীকার করি, কারণ ইহা বিধি বহির্ভূত। যার ফলে আমার মনে হচ্ছে আমার পরীক্ষা ভালো হওয়ার পরেও আমি চাকুরি পাওয়ার উপযুক্ত হই নাই। এমতাবস্থায় উক্ত নিয়োগ ও নির্বাচনী পরীক্ষা বাতিল করার জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল লতিফ বলেন, সবকিছুই নিয়মের ভেতর দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে হয়েছে। শুধু প্রশ্ন সেটিং দেরি হওয়ায় নির্দিষ্ট টাইমে আমরা পরীক্ষা নিতে পারি নাই। এই ব্যর্থতা সামগ্রিকভাবে আমার একার না। যারা প্রশ্ন সেটআপ ছিল তাদেরসহ। এজন্য আমি পরীক্ষার হলে গিয়ে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। তিনি বলেন, প্রত্যেক পদে একজন প্রার্থীর বিপরীতে ৭/৮ জন প্রার্থী রয়েছে। বাকি ব্যর্থরা যারা আছে, তারা নিশ্চয়ই সুযোগ-সুবিধা থাকলে অভিযোগ দিবে এটাই স্বাভাবিক। সামগ্রিকভাবে নিয়মের বাইরে শুধু একটা জিনিস হয়েছে সেটা হল পরীক্ষা সিডিউল টা ঠিক রাখতে পারি নাই। বাকি যা কিছু অনুষ্ঠিত হয়েছে, সবকিছুই নিয়মতান্ত্রিকভাবে। নিয়োগ এখনও সম্পন্ন হয়নি। পরিচালনা পর্ষদের মিটিংয়ে সেটা সিদ্ধান্ত হবে। সভাপতি মহোদয় বৃহস্পতিবার মিটিং ডেকেছেন। তিনি আমাকে বলেছেন,যে যাই বলুক কিছু যায় আসে না,ওই মিটিংয়ে নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অধ্যক্ষ বলেন,এখানে আমি খুবই অসহায়। নিয়োগ পরীক্ষার জন্য বাইরে থেকে যারা এসেছেন,তারা কোথায় থেকেছেন,খেয়েছেন,কি করেছেন ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার কোন ইনভলমেন্ট নেই। পরিকল্পিতভাবে ঐ প্রক্রিয়া থেকে আমাকে বাইরে রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শেখ কামরুজ্জামান বলেন,’অত্যন্ত স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সাথে আমরা নিয়োগ পরীক্ষা নিয়েছি। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গিয়ে এখন নানা ধরনের অভিযোগ উঠছে। দলীয়ভাবে অনেককে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আমার উপর প্রচন্ড চাপ ছিল। একদম অযোগ্য লোককে তো আর নিয়োগ দেওয়া যায় না। এখনও আমরা কাউকে নিয়োগ দেয়নি। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে তাই এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।এরপর নিয়োগ কার্যকরের ব্যাপারে সিধান্ত গ্রহন করা হবে। জিবি’র মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে’।



