হেবা ও দানপত্র দলিলের অপব্যবহার

পদক্ষেপ নিতে আইনি নোটিশ
রেজিস্ট্রির পূর্বে বাধ্যতামূলক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালুর দাবি
প্রবাহ রিপোর্ট : নারীদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অন্যতম হাতিয়ার হেবা ও দানপত্র দলিলের অপব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও রেজিস্ট্রেশন অধিদফতরের মহাপরিচালককে এ নোটিশ পাঠানো হয়। রেজিস্ট্রি ডাক ও ইমেইলের মাধ্যমে গতকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান এ নোটিশ পাঠান। নোটিশে তিনি এ জাতীয় হেবা ও দানপত্র দলিল রেজিস্ট্রির পূর্বে একটি বাধ্যতামূলক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালুর দাবি জানিয়েছেন। নোটিশে বিষয়টির প্রেক্ষাপট তুলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীরা উত্তরাধিকারসূত্রে পৈতৃক সম্পত্তির ন্যায্য অংশ থেকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বঞ্চনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো হেবা ও দানপত্র দলিলের অপব্যবহার। বর্তমানে বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বয়স্ক পিতা-মাতা, যারা তাদের শেষ জীবনে ছেলেদের আশ্রয়ে থাকেন, তাদের ওপর মানসিক এবং সামাজিক চাপ প্রয়োগ করে সম্পত্তি হেবা বা দানপত্র দলিল আকারে ছেলেদের নামে লিখে নিতে বাধ্য করা হয়। এই দলিলগুলো আইনত বৈধ দেখালেও বাস্তবতা হলো, অনেক সময় এই দলিলগুলোর পেছনে থাকে ছেলে ও ছেলেদের স্ত্রীদের ব্যাপক চাপ, নির্ভরতার সুযোগ গ্রহণ, প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতি, কিংবা ভয়ভীতি। ফলে ওইসব মা-বাবা তাদের মেয়েদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে ছেলেদের একতরফাভাবে সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে দেন, যা ইসলামী উত্তরাধিকার নীতিমালা ও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবিচার। আইনি নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে হেবা ও দানপত্র দলিল রেজিস্ট্রির সময় রেজিস্ট্রার বা সাব-রেজিস্ট্রাররা কোনো যাচাই করেন না যে দাতার ইচ্ছা স্বাধীন কিনা, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ও সচেতন কিনা, বা তিনি তার সব উত্তরাধিকারীদের ব্যাপারে সচেতন কিনা। এমনকি দলিলের ফলে কন্যাসন্তান বা নারী উত্তরাধিকারীরা সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হয় না। নোটিশে দাবি করা হয়েছে, সরকার যেন অবিলম্বে একটি বিধান প্রণয়ন করে, যাতে রেজিস্ট্রেশনের আগে দাতার উপস্থিতিতে একটি স্বাধীন যাচাই কমিটি (যেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং আইন সহায়তা প্রতিনিধিরা থাকতে পারেন) নিশ্চিত করেন যে হেবা বা দানপত্র দলিল সম্পূর্ণভাবে ইচ্ছাকৃত, বাধাহীন ও নারীদের বঞ্চিত না করে সম্পাদিত হয়েছে। আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এই সমাজে মেয়েরা আজও তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কারণ আইন যেভাবে লেখা হয়েছে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। হেবা ও দানপত্র দলিল অনেক সময় বৈধতার আড়ালে একতরফা স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইসলামে স্পষ্টভাবে উত্তরাধিকার বণ্টনের ন্যায়নীতি নির্ধারিত আছে। কেউ স্বেচ্ছায় সম্পত্তি হেবা করলেও সেটি যদি অন্য উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করে, তবে তা ন্যায়বিচার পরিপন্থি। এ কারণে ইসলামী মূল্যবোধ, মানবাধিকার ও সংবিধানের সমতা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন সংস্কার জরুরি। এই উদ্যোগ শুধু নারীদের পৈতৃক অধিকার রক্ষার প্রয়াস নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আইনি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবেও বিবেচিত হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেন অ্যাডভোকেট মো. মাহমুদুল হাসান। নোটিশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা দেওয়া না হলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।



