খুলনায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষে রাজপথ ছিল রণক্ষেত্র

# ফিরে দেখা খুলনার রক্তাক্ত ২ আগস্ট ২০২৪ #
# পুলিশ সদস্য নিহত ঃ শতাধীক আন্দোলনকারী আহত #
স্টাফ রিপোর্টারঃ ২ আগস্ট’২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা গণমিছিলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে খুলনা। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে সুমন ঘরামি নামে পুলিশের এক সদস্য (কনস্টেবল) মারা যান। এ সময় আরও ২০ পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। ওই সময় খুলনা সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর চার পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে একজন মৃত ছিল। তার নাম সুমন ঘরামি। অপর তিন জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তারা হলেন মাজহারুল ইসলাম, সোহানুর রহমান সোহাগ ও সৌমেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক বলেন, সংঘর্ষে সুমন ঘরামি নামে পুলিশের এক কনস্টেবল নিহত হন এবং পুলিশের ২০ সদস্য আহত হয়েছেন। একজনকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। জানা গেছে, খুলনার জিরো পয়েন্ট ও গল্লামারী মোড় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শুক্রবার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের তিন দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে অসংখ্য টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শিক্ষার্থীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকল ছোড়ে। এ সময় বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা পুলিশের একটি পিকআপে আগুন ধরিয়ে দেয়। শুক্রবার ২ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ (রাবার বুলেট ও ছররা গুলি) অবস্থায় সাত জনসহ ১৬ জনকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে চার জনের অবস্থা গুরুতর। আহত আরও আসছিল। টিয়ার শেলের আঘাতে শতাধিক মানুষ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার থেকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সযোগে গুরুতর আহত অনেককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এদিন বিকাল সোয়া ৩টায় প্রথম সংঘর্ষ হয়। পরে বিকাল ৪টায় ও ৫টা ৩৯ মিনিটে সংঘর্ষ হয়। প্রতিবাদী গান শেষে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে শিববাড়ির দিকে রওনা হয়। এ সময় গল্লামারী মোড়ে পুলিশ বাধা দেয়। এতে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময়ে মুহুর্মুহু টিয়ার শেল, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ। এতে পুরো গল্লামারী এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই তিন দফার সংঘর্ষে আহত হয় ১৬ জন। দু’জনকে গুরুতর অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরমধ্যে একজন পথচারীসহ সাত জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যালে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. মিলন বিশ্বাস বলেন, ৮০ জনের মতো শিক্ষার্থীকে তার সেন্টার থেকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যারা এসেছিলেন, অধিকাংশই টিয়ার শেল ও রাবার বুলেটের আঘাতে আহত ছিলেন। যাদের অবস্থা একটু গুরুতর, তাদের মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথম দু’ দফায় পুলিশ হামলা চালালে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। তারা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ফলে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময় পুলিশ আটক করা দু’ ছাত্রকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সংঘর্ষে ১০ জন ছাত্র আহত হয়। দু’জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অপর আটজনকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পুলিশের বাধা অতিক্রম করে ছাত্র শিক্ষক জনতার প্রতিবাদী গানের অনুষ্ঠান চলে। এরপর শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শিববাড়ি মোড়ের দিকে রওনা হয়। কিন্তু গল্লামারী পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। এতে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশ অবিরাম টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এতে এক পথচারীসহ আরও ছয় জন গুলিবিদ্ধ হন। ২ আগস্ট খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর যে বর্বর হামলা পুলিশ চালিয়েছে সেটা কখনো ভোলার নয় শিক্ষার্থীদের। সেদিন পুলিশের গুলিতে শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়, এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি কালো দিন ছিল এটি। অন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছে শিক্ষার্থীদের দাবি, দেশটাকে সংস্কার করে একটি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হোক। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাজ্জাদুল ইসলাম আজাদ জানান, ৪ জুলাই থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সক্রিয়ভাবে মাঠে নামে। তখন শুধুমাত্র আমরাই ছিলাম। পরবর্তীতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আমাদের পাশে ছিলেন। ২ আগস্ট খুলনায় পুলিশের প্রাণহানি সরকার ও পুলিশের ব্যর্থতার কারণে হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল গুলি করতে করতে শেষ হয়ে যায়। এরপর শিক্ষার্থীরা তাদের ধাওয়া দেয়। অবস্থা এমন হয়েছিল মসজিদে মাইকিং করে আমরা এলাকাবাসীর কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি কালো দিন ২ আগস্ট। এটা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে দিনটিকে আলাদা মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করব। সরকারের কাছে প্রত্যাশা জনগণের সরকার এবং বিপ্লবের সরকার একটি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী সাইফুল আলম বাবু বলেন, চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমার প্রথম থেকেই সমর্থন ছিল। এরপর ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সরকারের ছাত্র সংগঠনের ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়েছিল। ২ আগস্ট খুলনায় মিছিলে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কথা বলার জন্য কাছে ডেকেই টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট মারে। শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়। আহত কয়েকজনকে নিয়ে রাইসা ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য গেলে সেখানেও টিয়ারগ্যাস মারে পুলিশ। পুলিশ লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। পুলিশের সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। পুলিশ যেন কোন রাজনৈতিক দল বা কোনো সরকারের আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত না হয় সেই প্রত্যাশা নতুন সরকারের কাছে। পুলিশের সংস্কার চাই। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আইমান আহাদ জানান, ৩০ জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোডের একটি বাসায় খুলনার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ডাকি। এরপরই আমরা পুলিশের বাধার সম্মুখীন হই। আমি ৫২, ৭১ দেখিনি। তবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হামলা নির্যাতন দেখেছি। আমি এখনো মেন্টাল ট্রমায় আছি। সেই অধ্যায়টি এখনো পীড়া দেয়। প্রায়ই মিছিলের আওয়াজ শুনতে পাই, শুনতে পাই টিয়ারসেলের আওয়াজ ও ধমকানির চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে এখনো। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ডিসিপ্লিনের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী নুরুজ্জামান নাবিল বলেন, আমাদের ভাইদের যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শিক্ষার্থী হিসেবে ঘরে বসে থাকার মতো ছিল না সেই দিনগুলো। ২ আগস্ট খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়। টিয়ারগ্যাস ও মর্টার গ্যাসের পাশাপাশি রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় চারদিকে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমি সামনের দিকে এগিয়ে দেখি সামনে ৩০ জন পুলিশ ও বিজিবি ছিল। পুলিশ একটানা রাবার বুলেট ও গুলি নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেটে বুকের বাঁ পাশে রাবার বুলেট লাগে। এটা লাগার পর আমি ভীত না হয়ে আরও সাহসী হয়ে উঠলাম। হাতে কিছু ইট এবং স্লোগান দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। এরপর আমার বুক, গলা, কপালে অসংখ্য সরারা লাগে। একপর্যায়ে আমার সঙ্গে এক ভাইয়ের চোখে আঘাত লাগে। তাকে নিয়ে পেছনে সরে আসতে থাকি। সেখানে হঠাৎ করে এক লোক টিনের দড়ি খুলে আমাদের ভিতরে নিয়ে যায়। এরপর সেই ভাইকে নিয়ে খুলনা মেডিকেলে যায়। এরপর রাতে আমি সররা চেপে চেপে বের করি। পুলিশের টহল থাকায় বাসায় থাকতে পারিনি। বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে ছিলাম। নাবিল বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে দাবি- আমাদের একটা ন্যায়ের রাষ্ট্র ফিরিয়ে দিক। এমন একটা বাংলাদেশ দেখতে চাই যে, দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি থাকবে। প্রতিটি মানুষ ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে।



