খুলনায় সংঘর্ষ ও পুলিশ হত্যায় পুলিশের ৩ মামলা, আসামি ৮৫০০ : গ্রেফতার আতঙ্ক

# জুলাই গণঅভ্যুত্থান #
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তিন সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ কনস্টেবল সুমন কুমার ঘরামী হত্যা, থানায় হামলা এবং পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। চব্বিশের ৩ আগস্ট দায়েরকৃত মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের সাড়ে ৮ হাজার ছাত্র-জনতাকে আসামি করা হয়। তবে, এসব মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। এসব মামলার কারণে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খুলনার সেই সময়কার পুলিশ কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক জানান, পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় লবণচরা থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। এছাড়া সংঘর্ষের সময় সন্ত্রাসীরা হরিণটানা থানায় আক্রমণ করে। এ সময় ১০/১২ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়। এ ঘটনায় ওই থানায় মামলা এবং পুলিশের একটি ৫ টন ওজনের পিকআপ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সদর থানায় আরেকটি মামলা হয়েছে। সব মামলায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
লবণচরা থানার তৎকালীন ওসি মমতাজুল হক জানান, এস আই মোস্তফা সাকলাইন বাদি হয়ে শুক্রবার রাতে লবণচরা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলায় অজ্ঞাত পরিচয় ১ হাজার থেকে ১২শ’ জনকে আসামি করা হয়েছে।
হরিণটানা থানার ওই সময়কার ওসি জানান, থানায় হামলা, পুলিশ সদস্যরা আহত হওয়ার ঘটনায় ৫/৭ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে পৃথক একটি মামলা হয়েছে।
সদর থানার তৎকালীন ওসি কামাল হোসেন খান জানান, পুলিশের পিকআপে আগুনের ঘটনায় ৪০০/৫০০ ব্যক্তির নামে মামলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চব্বিশের ২ আগস্ট শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুর ২টার দিকে খুলনার নিউ মার্কেট এলাকা থেকে বৃষ্টি ও পুলিশের বাঁধা উপেক্ষা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা গণমিছিল শুরু হয়। মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে গল্লামারী মোড়ে পৌঁছায়। এরপরই জিরোপয়েন্টের দিকে থেকে পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে টিয়ারসেল ছোড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের যোগ দেয়। পরে বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেলে পুলিশ ধীরে ধীরে পিছু হটে যায়। পরে তারা জিরোপয়েন্টে অবস্থান নেয়। তবে, সেখানে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়া নিয়ে বিকাল ৪টার দিকে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ শুরু হয়। জিরোপয়েন্ট মোড়ে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের দুই পাশ দিয়ে ঘিরে রাখে পুলিশ। পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশ একের পর এক টিয়ালসেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। তাদেরও সাজোয়া যান নিয়ে ঘিরে রাখে পুলিশ। সেখানেও টান টান উত্তেজনা বিরাজ করে।
এদিকে, ছাত্র-জনতার গণমিছিল কর্মসূচিকে কেন্দ্র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চলা পুলিশের প্রায় ঘণ্টা ব্যাপী সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আসে। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করবে এমন আশ্বাসে-পুলিশ পিছু হটে যায়। পরে আন্দোলনকারীরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সমাবেশ শুরু করে। সমাবেশ শেষে বিকেলে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শিববাড়ি মোড়ের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ বাঁধা দেয়। এ সময় আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তৃতীয় দফায় সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ। এ সময় মুর্হুমূর্হু টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। এতে পুরো গল্লামারী এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে এক পথচারীসহ কমপক্ষে ৬ জন গুলিবিদ্ধ হন। গল্লামারী ব্রিজের এক পাশে শিক্ষার্থী ও অপর পাশে অবস্থান নেয় পুলিশ। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে অসংখ্য টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শিক্ষার্থীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকল ছোড়ে করে। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা পুলিশের একটি পিকআপে আগুন ধরিয়ে দেয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষে সুমন ঘরামী (৩৩) নামে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। তিনি পুলিশ লাইন্সে কর্মরত ছিলেন।
এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা মহানগরের যুগ্ম সদস্য সচিব মুহিব্বুল্লাহ মুহিব বলেন, ২ আগস্ট পুলিশ ছাত্র জনতার উপর তিন দফায় হামলা চালায়। এ সময় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা আহত হয়। এর মধ্যে একজন পুলিশ সদস্যও নিহত হয়। এই ঘটনার জের ধরে রাতেই পুলিশ ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে আলাদা তিনটি মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় সাড়ে বারো হাজার মানুষকে আসামি করা হয়। মূলত: গ্রেপ্তার আতঙ্কে তিন আগস্ট খুলনায় কোন আন্দোলন কর্মসূচি ছিল না। যদিও ৪ আগস্ট ফের আন্দোলন শুরু হয় শিববাড়ি মোড়ে।



