সম্পাদকীয়

বৈধ বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ হলে চোরাচালানের দুয়ার খুলে যাবে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূগোল পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক এক অস্বস্তিকর মোড় নিয়েছে। গত জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণ-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রতিবেশী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন প্রকট হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ায় ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। এই পরিস্থিতির ছায়া পড়েছে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপরও। ভারত একের পর এক বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশও কিছু আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ফলে দুই দেশের বৈধ বাণিজ্য প্রবাহ বিঘিœত হচ্ছে। হ্রাস পাচ্ছে রপ্তানি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাজার হাজার উদ্যোক্তা, উৎপাদক, পরিবহন শ্রমিক এবং বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সাধারণ মানুষ। ভারত তৃতীয় দেশে বাংলাদেশি পণ্য পরিবহনের জন্য দেওয়া ট্রানজিট সুবিধা প্রত্যাহার করায় সমস্যার মাত্রা আরও বেড়েছে। বিকল্প হিসেবে সমুদ্রপথ বেছে নেওয়া গেলেও এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুণ, সময়ও লাগছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের পচন ও ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো-এই পরিস্থিতিতে বৈধ পথে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হলে সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্য বাড়তে পারে। বাংলাদেশ পুলিশের সর্বশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এই আশঙ্কা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও অধিকাংশ অরক্ষিত সীমান্তজুড়ে চোরাকারবারিদের তৎপরতা বাড়তে পারে বলেই প্রশাসনের আশঙ্কা। ইতোমধ্যেই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সীমান্ত নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেবল নজরদারি কিংবা দমনমূলক পদক্ষেপে এই সংকটের সমাধান আসবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোত্তম পথ হচ্ছে-দুই দেশের মধ্যে দ্রুত এবং ফলপ্রসূ কূটনৈতিক সংলাপ। যেহেতু এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট, সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫ আগস্টকে সামনে রেখে দুই দেশকে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের পথে এগোতে হবে। চোরাচালান কিংবা অবৈধ অর্থপাচারের ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে হলে বৈধ বাণিজ্যের পথকে সহজ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু কূটনীতিক বা রাজনীতিকদের বিষয় নয়-এটি দুই দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। পারস্পরিক বোঝাপড়া, আস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সম্পর্কই কেবল এ অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির গ্যারান্টি হতে পারে। আমরা আশা করি, দায়িত্বশীলতা ও বাস্তববোধের জায়গা থেকে দুই দেশের নেতৃত্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button