খুলনায় ইলিশ কিনতে হোঁচট খাচ্ছেন ক্রেতারা’

# ভরা মৌসুমেও দাম বাড়তি, বিপাকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের, মনিটরিংয়ের দাবি #
# ব্যবসায়ীরা বলছেন : জালে মাছ কম ধরা পড়ছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, তাই দাম বাড়তি #
# সংশ্লিষ্টরা বলছেন : ইলিশের মাইগ্রেটারি রুটে প্রচুর জালের ব্যবহারে মাইগ্রেশন ব্যাহত হচ্ছে #
মো. আশিকুর রহমান : শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন। অন্যদিনের তুলনায় এই ছুটির দিনটিতে বেচাকেনার জন্য খুলনা মহানগরীর নিত্যপণ্যে, মাছ, মাংস ও সবজীর বাজারগুলোতে সর্বস্তরের ক্রেতা সমাগম ঘটে। কিন্তু ভাবনার বিষয়, ভরা মৌসুমেও খুলনায় ইলিশের বাজারে সরবরাহ কম। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম আকাশ ছোঁয়া। খুলনার বাজারে বরিশাল, ভোলা, কুয়াকাটা, চর দোয়ানি, আলীপুর, বগি, নলী এলাকা হতে ইলিশ আসছে, এছাড়া ৪/৫ দিন ধরে চিটাগাং থেকে জাটকা ইলিশ আসছে। ভরা মৌসুমে ইলিশের দাম আকাশ ছোয়া হওয়ার দরুন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ইচ্ছা থাকলেও সাধ্য নেই ইলিশ কেনার, ওই সকল শ্রেনী মানুষগুলো কেবল দেখার ভেতরই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কার্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে সমুদ্রে মাছ একটু কম ধরা পড়ছে। মাছ সমুদ্র হতে নদীতে মাইগ্রেট (স্থানান্তর) করে। মাইগ্রেটারি যে রুট গুলো আছে, ওই রুটে প্রচুর পরিমানে জাল (নেট) ব্যবহার হয়, এতে মাইগ্রেশন ব্যাহত হচ্ছে। ইলিশ মাইগ্রেট করার ক্ষেত্রে পরিবেশ একটি কারণ, তাছাড়া জলাবায়ূ পরিবর্তনের কারণেও ইলিশের মাইগ্রেটারি সিস্টেমটাকে ব্যাহত হচ্ছে। মৌসুমের এখনো ২ মাস বাকি আছে, আগামী সেম্পেম্বর-অক্টোবর মাসে জালে ব্যাপক আকারে ইলিশ ধরা পড়বে, এমনটাই তাদের প্রত্যাশা। গত বছর সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা হয়েছে, চলতি বছরেও তেমনটি প্রত্যাশা তাদের।
ইলিশ ব্যবসায়ী বলছেন, মৌসুম চললেও সাগরে জেলেদের জালে মাছ কম ধরা পড়ছে। যে কারণে বাজারে ক্রেতা চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। তাই আড়ৎ হতে শুরু করে খুচরা বাজারেও দামের প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা আশাবাদী, এখনো সিজিনের দু’মাস আছে। জেলেদের জালে মাছ বেশি উঠলে, সর্বত্র দাম নাগালের মধ্যে চলে আসবে। পাশাপাশি নগরীর খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমরা যে দামে আড়ৎ বা পাইকারী বাজার থেকে মাছ কিনি, তা হতে খরচ-খরচা বাদে সামান্য লাভে বিক্রি করি। খুলনা মাছ বাজারে আসা একাধীক ক্রেতাগন বলছেন, ইলিশের গাঁয়ে যেন আগুন লেগেছে, ভরা মৌসুমেও দাম আকাশ ছোয়া। ইলিশ সুস্বাদু মাছ হওয়ার দরুন সবারই কেনার আগ্রহ থাকে। তবে ভরা মৌসুমে ইলিশের দাম বাড়তি থাকায় দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। তাদের অভিযোগ, সরবরাহের ঘাটতির অজুহাত দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়তি নিচ্ছে, মাছ মজুতের সিন্ডিকেটও হচ্ছে। গত বছর তুলনায় চলতি বছরে ইলিশের দাম বহু অংশে বেড়েছে। ক্রেতারা দাম বাড়তিসহ সার্বিক বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি বাজার নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের দাবি তুলেছেন।
নগরীর রূপসা মৎস্য আড়ৎ ও ৫ নং ঘাট পাইকারী মৎস্য আড়ৎতে দেখা গেছে, ভোর থেকেই ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ইলিশের কেনার হাঁকডাকে সরগরম গোটা বাজার এলাকা। ওই বাজারে কেজি জাটকা ইলিশের মূল্য ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, ৩ পিসে কেজি ১২০০-১৩০০’শ টাকা দরে, ৫০০-৬০০ গ্রাম ইলিশের মূল্য ১৭০০-১৯০০’শ টাকা, ৭০০-৮০০ গ্রাম ইলিশের মূল্য ২২০০-২৩০০’শ টাকা দরে, এক কেজির ওপরে ইলিশের মূল্য ২৪০০- ২৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই দিনে নগরীর খুচরা মাছ বাজারে প্রতি কেজি জাটকা ইলিশের মূল্য ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা, ৫০০-৬০০ গ্রাম ইলিশের মূল্য ২০০০-২২০০ টাকা দরে টাকা, ৭০০-৮০০ গ্রাম ইলিশের মূল্য ২৩০০-২৫০০ টাকা, এক কেজির ওপরে ইলিশের মূল্য ২৬০০- ২৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। স্থানীয় আড়ৎদার এবং খুচরা বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইলিশ বিক্রির আড়ৎ গুলোতে সরবরাহ কম থাকায় দাম একটু বাড়তি, সরবরাহ বাড়লে, দাম কমবে বলে জানিয়েছেন তারা।
ময়লাপোতা সন্ধ্যা বাজারের ক্রেতা রিফাত আহম্মেদ জানান, বাজারে ইলিশের দাম বেশ চড়া। গভীর সমুদ্র হতে প্রাপ্ত ইলিশ চাষ করা লাগে না। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎস হতে পাওয়া গেলেও কয়েক স্তর ঘুরে বাজারে এসে ইলিশের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যা নি¤œ আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ভরা মৌসুম চললেও বিক্রেতারা সরবরাহের ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়তির নিচ্ছে। গত বছর দাম ক্রেতা নাগলের মধ্যে থাকলেও এ বছর দাম অনেক বাড়তি।
ক্রেতা মনির মোড়ল জানান, ব্যবসায়ী বলছেন সরবরাহ কম। মাছ কোথায় যাচ্ছে। প্রচুর মাছ ধরা পড়লেও নদী-সমুদ্র হতে আগেই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে মাছ মজুত করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। যে কারনে বাজার গুলোতে সরবরাহ কম হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট বন্ধ করলে ইলিশের সরবরাহ বাড়বে, দাম কমবে। পাশাপাশি সিন্ডিকেটকারীদের আইনের আওতায় আনা উচিৎ বলে আমি মনি করি। ইলিশ কিনতে আসা ক্রেতা মুক্তা কর্মকার জানান, একটি বেসরকারি কোম্পানীতে চাকুরী করি। সারা মাস মোটামুটিভাবে চলতে পারি। গতকাল দৌলতপুর মাছ বাজারে এসে ছিলাম ইলিশ কেনার জন্য। ইলিশের যে দাম, না কিনে চলে গেলাম। বড় ইলিশ কিনতে না পারলেও ঝাটকা ইলিশ কিনতে চেয়ে ছিলাম। ওই ইলিশ ৭/৮’শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আমার একটা চাকুরী করি তাই কনতে পারিনাই, দাম বেশি। ইলিশ একটি সু-স্বাদু, জনপ্রিয় মাছ। সবাই খেতে চাই, যারা নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষেরা কিভাবে কিনে খাবে। তাদের ইচ্ছা থাকলেও সাধ্য নাই। সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানাচ্ছি।
ইজিবাইক চালক ইদ্রিস আলী জানান, মেয়েটা কয়েকদিন করে একটা ইলিশ মাছ নেওয়ার জন্য বলে। ৬ জনের একটা পরিবার আমার। সবমিলিয়ে ১টা ইলিশ মাছ কিনতে দোকানদার চাইলো ১৩’শ টাকা। দাম শুনে ফেরৎ চলে আসলাম। আমার কাছে ৭’শ টাকা ছিলো, ভাবলাম আরো ৫’শ টাকা জমিয়ে তারপর কিনি। ইলিশ চাষ করা লাগে না, তারপরও এমন দাম। আমাদের মতো গরীব মানুষ কিভাবে ইলিশ খাবো?
খালিশপুর বাজারের খুচরা ইলিশ বিক্রেতা মুনসুর বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম এজন্য দাম বেশি। আমাদের বেশি দামে কিনতে হয় এজন্য বেশি দামে বিক্রয় করতে হয়। কিন্তু সামান্য লাভে বিক্রি করি। খুচরা ইলিশ বিক্রেতা আঃ বারেক জানান, ইলিশের মৌসুম চললেও সাগরে জেলেদের জালে মাছ কম ধরা পড়ছে, যে কারণে বাজারে ক্রেতা চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। জেলেদের জালে মাছ বেশি উঠলে, আড়ৎ ও পাইকারী বাজারে মাছের সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যাবে। পাইকারী বাজার থেকে আমরা যে দামে কিনি, তা হতে সামান্য লাভে বিক্রি করি। তবে গত বছর এই সময়ে মাছের দাম কম ছিল।
রূপসা পাইকারী মাছ বাজারের বেঙ্গল ফিস আড়ৎতের মালিক লিটন জানান, সিজন আরো আগে শুরু হলেও সরবরাহ সেভাবে হচ্ছে না। ইলিশের মৌসুম চললেও সাগরে জেলেদের জালে মাছ কম ধরা পড়ছে, যে কারণে বাজারে ক্রেতা চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, দাম একটু বাড়তি। সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যাবে।
খুলনা জেলা মৎস কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানান, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও জালে মাছ কম ধরা পড়ছে। যে কারণে বিগত বছরের তুলনায় বর্তমানে বাজারে ইলিশের দাম বাড়তি। আমরা দামের ব্যাপারে খুলনার পাইকারী ও খুচরা বাজার নিয়মিত মনিটরিং করি। আমরা আশঙ্কা করছি যে, মাছ একটু কম ধরা পড়ছে। মাছ সমুদ্র হতে নদীতে মাইগ্রেট (স্থানান্তর) করে। আমাদের মাইগ্রেটারি যে রুট গুলো আছে, ওই রুটে প্রচুর পরিমানে জাল (নেট) ব্যবহার হয়, এতে মাইগ্রেশন ব্যাহত হচ্ছে। ইলিশ মাইগ্রেট করার ক্ষেত্রে পরিবেশ একটি কারণ, তাছাড়া জলাবায়ূ পরিবর্তনের কারণেও ইলিশের মাইগ্রেটারি সিস্টেমটাকে ব্যাহত হচ্ছে। মৌসুমের এখনো বাকি আছে, আগামী সেম্পেম্বর-অক্টোবর মাসে জালে ব্যাপক আকারে ইলিশ ধরা পড়বে, এমনটাই প্রত্যাশা। গত বছর সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা গত বছরের তুলনায় ইলিশ যেন না কমে, যেন বাড়ে। এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষন অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম জানান, খুলনা বাজার নিয়ন্ত্রনে রাখতে আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং অব্যহত রেখেছি। নিয়মবর্হিভূত ব্যবসা পরিচলনার জন্য জরিমানা করা হচ্ছে। যেহেতু খুলনার ইলিশের পাইকারী ও খুচরা বাজারে দাম বাড়তি বিষয়ে অবগত করা হয়েছে। মনিটরিং করে ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
