অবুঝ তিন শিশুকে নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী

রূপসায় চাঞ্চল্যকর মানিক হত্যার আসামি সন্ত্রাসী
মাসুম বিল্লাহ ও কিবরিয়া ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
মিনা কামালের অবৈধ অস্ত্র ভান্ডার কিবরিয়া ও মাসুমের নিয়ন্ত্রণে : অভিযোগ বাদীর
আ’লীগের মন্নুজানের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা মাসুমের নেতৃত্বে চলছে সন্ত্রাসী বাহিনী
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনায় আওয়ামীলীগের সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের শেল্টারে বেড়ে ওঠা ক্রসফায়ারে নিহত মিনা কামাল ওরফে ফাটাকেষ্ট’র ভাই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মাসুম বিল্লাহ ও গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে রূপসার চাঞ্চল্যকর ইমরান হোসেন মানিক হত্যা মামলা হলেও তারা রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। হত্যাকা-ের পর থেকে এ মামলার আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর থাকলেও এলাকার একটি মহল বলছে আসামি আটকে পুলিশ ঝিমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আসামীরা আত্মগোপনে রয়েছে। এসব আসামীরা আত্মগোপনে থেকে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অনৈতিক কর্মকান্ড। তবে এ মামলার অন্যতম এক আসামি তার এক পুলিশ অফিসার আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, নিহত মানিকের বড় মেয়ে ১২ বছর বয়সী তাসকিয়া আক্তার মরিয়াম রূপসার বাগমারা সামছুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী, ছয় বছর বয়সী বাগমারা খাজাবা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সালমান সুলতান নাঈম ও তিন বছর বয়সী ছোট্ট শিশু কন্য মারিয়া আক্তার মিষ্টি পিতাকে হারিয়ে দুর্বিসহ জীবন-যাপন করছে। আর তিন অবুজ শিশুকে নিয়ে মানিকের স্ত্রী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। নৃশংস এ হত্যাকা-ের ন্যায় বিচারের দাবি জানিয়েছেন অসহায় স্ত্রী ও পিতাহারা শিশু সন্তানরা। মানিক হত্যার পর থেকে মামলার বাদীসহ তার পরিবারের সকলে রয়েছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
এদিকে, মাসুম বিল্লাহ’র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকা স্বত্বেও কতিপয় রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায়ে সে তদবির করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ধুরন্দর টাউট ও ঠান্ডা মাথার খুনি মাষ্টার মাইন্ড এই সন্ত্রাসী মাসুম বিল্লাহ’র অতীতের কথা এখনও সাধারণ মানুষ ভুলেনি।
অভিযোগ আছে, ফাঁটাকেষ্ট মিনা কামালের থেকেও বেপরোয়া এই মাসুম বিল্লাহ। মিনা কামালকে বিভিন্ন ধরণের বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন মাসুম বিল্লাহ। অতীতে একটা সময় মাসুমের অত্যাচারে এলাকার সাধারণ মানুষ থাকতেন আতংকে। পূর্বে আওয়ামীলীগের বিনা ভোটের সরকার গঠনের পর নিহত মিনা কামাল ও তার ভাই মাসুম বিল্লাহ আওয়ামীলীগের তৎকালীন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের ছত্রছায়ায় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলো। এই প্রতিমন্ত্রীকে মাসুম ও তার ভাই মিনা কামাল বুবুজান বলে সম্বোধন করতেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি নেতা কর্মীরা যখন হামলা-মামলার শিকার এবং পুলিশ লীগের অত্যাচারে বাড়িতে ঘুমাতে পর্যন্ত পারিনি, ওই সময় মাসুম শ্রমিক দল করলেও কখনও তাকে বিএনপির দলীয় কর্মকা-ে ও মাঠ পর্যায়ে মিছিল মিটিংয়ে দেখা যায়নি বলে রূপসাবাসীর একাধিক অভিযোগ। কিন্তু ৫ আগষ্টের পর ভোল পাল্টিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের কিছু নেতাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন যারা তারাই বর্তমানে এই হত্যা মামলার আসামী মাসুম ও কিবরিয়াকে সহযোগিতা করে আসছে বলে বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা গেছে।
এদিকে, ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভোরে র্যাব-৬ পূর্ব রূপসার বাগমারা এলাকা থেকে একটি বিদেশী পিন্ডলসহ মাস্টার মাইন্ড মাসুমকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। মিনা কামাল ক্রসফায়ারে নিহতের পর তার যত অবৈধ অস্ত্র ভান্ডার আসামী কিবরিয়া ও মাসুম বিল্লাহ’র কাছে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে সেসব অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ৯০’র দশকে রামপালের ফয়লায় রেনু পোনার বাস ডাকাতির মাষ্টার মাইন্ডও মাসুম বিল্লাহ। ওই সময় বাস ডাকাতিকালে ৫ জনকে হত্যার ঘটনায় মাসুমের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। প্রায় ২০ বছর আগে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে রূপসার বিশিষ্ট সমাজসেবক আক্তার হোসেন খানকে গুলি করে হত্যার চেষ্টার মুলহোতাও ছিলেন এই মাসুম বিল্লাহ। এ ঘটনায় মামলাও হয়। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের কিছু অসাধু নেতাদের ছত্রছায়ায় নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই মাসুমের অত্যাচারে এলাকায় কোন লোক ভয়ে কথা বলতে সাহস পর্যন্ত পায়না। এর অত্যাচারে এলাকার সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাসুম বিল্লাহ ইন্ডিয়া থেকে চোরাই পথে মহিষ এবং কয়লা এনে বাংলাদেশে সাপ্লাই দেয়। এ ব্যবসাকে পুঁজি করে অঢেল কালো টাকার মালিক হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অন্যের জমি জোর করে নেওয়া, ঘের দখল, ফকিরহাট ও দাকোপের বাজুয়ায় অঢেল সম্পত্তি, বাজুয়ার চালনা মেরিন সী ফুডস এর ব্যবসায়ী পার্টনার এবং কাটাখালিতে আলিশান মার্কেটসহ অঢেল অর্থ-সম্পত্তির মালিক বনে গেছে মাসুম।
এ ব্যাপারে মানিক হত্যাকা-ের হুকুমের আসামী কিবরিয়া ও মাসুম বিল্লাহসহ অন্যান্য আসামিদের সাথে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করা হলেও তারা আত্মগোপনে থাকার কারণে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মামলার বাদী মো. মাসুদ হাওলাদার বলেন, আমার ভাই মানিক কোন অপরাদের সাথে জড়িত ছিলো না। পরিকল্পিতভাবে মিনা কামালের অন্যতম সহযোগী মাদক ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া ও মিনা কামালের আপন ভাই সন্ত্রাসীদের গডফাদার মাসুম বিল্লাহ’র হুকুমে তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে নৃশংস ভাবে গুলি করে হত্যা করে মানিককে। মিনা কামাল ক্রসফায়ারে নিহতের পর তার যত অবৈধ অস্ত্র ভান্ডার আসামী কিবরিয়া ও মাসুম বিল্লাহ’র কাছে রয়েছে। বর্তমানে সেসব অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এর আগে র্যাব বিদেশি পিস্তলসহ বাগমারা নিজ বাড়ি থেকে মাসুমকে আটক করেছিলো।
মামলার বাদী আরও অভিযোগ করেন, এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করত মাসুম বিল্লাহ ও কিবরিয়া। যে কারণে মাদক বিক্রিতে মানিক প্রতিবাদ করলে কিবরিয়া ও মাসুমের মাদক সিন্ডিকেটের ক্ষতি হয়। যে কারণে আসামী কিবরিয়া ও মাসুমের হুকুমে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে মানিককে নৃশংস ভাবে হত্যা করানো হয়। আমার ভাই হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বব মহামান্য আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ন্যায়বিচার দাবি করছি।
রূপসা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, মানিক হত্যা মামলার আসামীরা আত্মগোপনে রয়েছে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত মানিক হত্যাকা-ের সকল আসামি গ্রেফতার না হবে এবং চার্জশিট দেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আসামি গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উল্লেখ্য : গত ৪ সেপ্টেম্বর আনুমানিক রাত ১১ টার দিকে উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামস্থ জয়পুর এয়ারটেল টাওয়ারের পাশে জনৈক রেজাউল মাস্টারের বাড়ির উত্তর পাশে রাস্তার উপর সন্ত্রাসীরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মানিককে পিস্তল দিয়ে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে ৬ সেপ্টেম্বর নিহতের ভাই মো. মাসুদ হাওলাদার বাদী হয়ে মাসুম বিল্লাহ ও কিবরিয়াসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে রূপসা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।



