রূপসায় আ’লীগের দোসর মাঝি সংঘের সাধারণ সম্পাদক হারেজ বহাল তবিয়তে

যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলেও গ্রেফতার হয়নি
কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের দাবি মাঝিদের
স্টাফ রিপোর্টার : ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর খুলনার রূপসায় মাঝি সংঘের বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদারের বিরুদ্ধে যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলেও রয়েছেন বহাল তবিয়তে। আওয়ামী লীগের খুলনা-৪ আসনের বিনা ভোটের সাবেক এমপি আব্দুস সালাম মুর্শিদীকে এই হারেজ মাঝি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার লোভে ফুলের সাজানো নৌকা মুর্শিদীর হাতে তুলে দেন। তারপর থেকে এই হারেজ হাওলাদার এর নেতৃত্বে চলছে রূপসা ঘাটে অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে। এ-সব অভিযোগ তুলে ধরেছেন ঘাটের সাধারণ মাঝি ও স্থানীয়রা। ৫ আগষ্টের আগে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের দেওয়া বিনা ভোটের অবৈধ কমিটি গঠন করা হলেও এখন রূপসা মাঝি ইউনিয়নের কমিটি চলছে রীতিমতো। যা বর্তমানে দেখার কেউ নেই এমন মন্তব্য করেছেন সাধারণ মাঝিরা।
বর্তমানে সাধারণ মাঝিদের ভিতর থেকে যারা ট্রলার ঘাট পরিচালনা করছে এবং যাত্রীদের ঘাট পারাপারে দায়িত্ব নিয়োজিত রয়েছেন তাদেরকে ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদার পলাতক থেকে তার লোকজনের মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে বলে সাধারণ মাঝিদের অভিযোগ। এমনকি উস্কানিমূলক কথা বলে অপপ্রচার চালিয়েও যাচ্ছে হারেজ এবং তার লোকজন। যার কারনে যেকোনো মুহুর্তে ঘটতে পারে মাঝিদের ভিতরে সহিংসতা এমনটি মনে করেছেন সাধারণ মাঝি ও স্থানীয়রা। হারেজ মাঝি মামলায় পলাতক থেকেও এখন টাকা উঠাচ্ছে তার লোকজন দিয়ে। মাঝি সংঘের সাধারণ সম্পাদক গেলো নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী সাদাত এর সাথে ড্র হয়। পরবর্তীতে ওই পদে পুনরায় নির্বাচন বা কোন লটারি পদ্ধতি না করে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের তৎকালিন এমপি সালাম মূর্শেদীর নির্দেশে সাধারণ সম্পাদকের চেয়ার দখল করে নেয় এই আওয়ামী লীগের দোসর হারেজ। তারই অংশ হিসেবে অবৈধভাবে মাঝি সংঘের কমিটি দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে রয়েছে চরমপন্থি সংগঠন-জনযুদ্ধের ক্যাশিয়ার উপাধি। ওই সময় হারেজ অপারেশন-ক্লিনহাটে যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হন।
এর আগে ৯ নভেম্বর ট্রলারে ধাক্কা লেগে নদীতে পড়ে গিয়ে যুবক মিঠুনের মৃত্যুর ঘটনায় মাঝি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদারসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তারপর আসামী হারেজসহ আরও কয়েকজন পুলিশের আটকের ভয়ে আত্মগোপনে রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই মাঝি হারেজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিছু মাঝির ন্যাশনাল আইডি কার্ড না থাকলেও তাদের অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করেছে। সআবার কিছু মাঝি ১৮ বছর না হলেও তাদেরকে দিয়ে হারেজ হাওলাদার মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ে মাঝি বানিয়েছে বলে সাধারণ মাঝিদেরও রয়েছে অভিযোগ। এসব অনিয়মের ঘটনায় হারেজের নিকটতম আত্মীয় ও সাধারণ মাঝিরা মন্তব্য করেছেন বর্তমান কমিটি সাধারণ সম্পাদক ঘাট চালাতে ব্যার্থ।
৯ নভেম্বর রাতে যে ট্রলার দুর্ঘটনায় একজন যাত্রীর মৃত্যু হয়-সেই ট্রলারের মাঝিও ছিলো হারেজের আত্মীয় শফিক বেপারী। সে একজন মাদকসেবী বলে জানান ঘাটের মাঝিরা। নদী পারাপারে নিয়মিত যাত্রীদের প্রশ্ন, এসব অনিয়ম দেখার কেউ নেই।
এদিকে, অভিযানিক দলকে ট্রলার দেওয়াসহ বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে মাঝি সংঘের সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদার ওই দিন শতাধিক ট্রলারে ট্রিপ দিয়ে অর্থ আত্মসাত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকার স্থানীয় লোকজনসহ সাধারণ মাঝিরা হারেজ এর বিরুদ্ধে এ-সব ঘটনার বিষয়টি অতিদ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অপরদিকে, মাঝি হারেজ হাওলাদার ২০০২-৩ সালে ক্লিনহাট যৌথ বাহিনীর অভিযানে রাতে আটক হয়। ওইদিন রাতেই হারেজের নিকট থেকে চানমারি নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী। ২০২২ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিপইয়ার্ড এলাকায় ডাকাতি হয়। সেই মামলায়ও হাজেরকে পুলিশ আসামি করে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে নড়াইলে ডাকাতি করতে গিয়ে হারেজ হাওলাদার গ্রাম বাসির হাতে প্রথমে আটক হয়। পরে ওইদিন জনগণ গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে হারেজকে হস্তান্তর করে। সে ওই ডাকাতি মামলায়ও কারাভোগ করে। এখনও পর্যন্ত ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে উশৃংখল ছেলেদের দিয়ে সাধারণ মাঝিদেরও অপমান অপদস্ত করে এবং তাদেরকে মারপিট করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও হারেজ এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের বিস্তার অভিযোগ।
মাঝিরা আরও বলেন, তৎকালীল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের লোক হয়ে এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলো। এখনও হারেজের অত্যাচারে সাধারণ মাঝি ও স্থানীয়রা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৯ নভেম্বর রাতে রূপসা ঘাট পারাপারের সময় পূর্ব রূপসা প্রান্তে ট্রলার ভেড়ানোর সময় চালকের খামখেয়ালীপনায় নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয় মহিদুল হক মিঠুন। ওই রাতেই ট্রলারটি জব্দ করে রূপসা নৌ-পুলিশ। ঘটনার পর পরই নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস তল্লাশি অভিযান শুরু করে। পরদিন ১০ নভেম্বরও সকাল থেকে শুরু হয় ফের তল্লাশি অভিযান। পরে প্রায় ৭০ ঘন্টা পর মিঠুনের মরদেহ ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। এ বিষয়ে মাঝি মোঃ শুকুর হাওলাদার বলেন, আমি ঘাটের একজন সাধারণ সদস্য। এই ঘাটে অনেক অনিয়ম হয়েছে। মাঝি কমিটির একজন প্রতিদিন সন্ধ্যায় এসে প্রতিটি ট্রলার থেকে ২২০ টাকা আদায় করত এবং প্রতি ট্রলারে ৫ জন করে অতিরিক্ত লোক ওটাতো। এসব অনিয়ম নিয়মিত হতো। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব কাজ অনেকটাই কমে গেছে। এসব অনিয়মের বিরোধিতা আমরাই করেছি। এছাড়াও সেক্রেটারি হারেজ হাওলাদার ও কমিটির অন্য দায়িত্বশীলরা ছদ্মনাম ব্যবহার করে পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকা তুলতো এবং নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করতো। টাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা কোনো সঠিক তথ্য দিতো না।
এখন ঘাটের অনিয়ম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন চেয়ারম্যান কামাল হোসেন বুলবুলের নেতৃত্বে এই কমিটি জালিয়াতির মাধ্যমে গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানের এ ঘাট চালাতে অক্ষম কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের দাবি।
মাঝি মোঃ শাহীন শিকদার বলেন, পূর্বে ট্রলারপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ জন যাত্রী নেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনিয়ম করে ৩৫ থেকে ৪০ জন পর্যন্ত যাত্রী তোলা হতো। তখন কোনো নিয়ম-কানুন মানা হতো না। কিন্তু আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি ট্রলারে ২৫ জন যাত্রী নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি, আর বড় ট্রলারে সর্বোচ্চ ৩০ জন যাত্রী নেওয়ার কথা বলেছি। আমরা নতুন সাতজন ঘাটে দায়িত্ব পেয়েছি। আমরা ঘাটের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে চাই এবং নিয়ম-কানুন অনুযায়ী ঘাট পরিচালনা করতে চাই। চলমান জালিয়াতি কমিটি ভেঙে একটি নতুন দায়িত্বশীল কমিটি গঠনের জোরালো দাবি। ট্রলার যাত্রীদেরও অভিযোগ এ ঘাটের বর্তমান কমিটি দিয়ে ঘাট চালালে এভাবেই থেকে যাবে অনিয়ম।
মাঝি সংঘের সাধারণ সম্পাদক মোঃ হারেজ হাওলাদার বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের মাঝি সংঘের লোকজন ও নেতারা আমাকে বাদ দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।



