স্থানীয় সংবাদ

নারীরা কি কোনো রাতের শিফট বা ওভারটাইমের জন্য নিরাপদ?

লেখক: এস কে আহমেদ শাহরিয়ার, আইন শিক্ষার্থী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের ধীরে ধীরে ২৪ ঘণ্টাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার ফলে পোশাকশিল্প, সেবা খাত, স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল কাজের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যেখানে রাতের শিফট ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এখন স্বাভাবিক বিষয়। তবে যারা গভীর রাতে বাড়ি ফেরেন বা অতিরিক ওভারটাইমের পর কাজ ও সংসারের ভারসাম্য রক্ষা করতে বাধ্য হন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের আইন ও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনো ভাল মেলাতে পারেনি। বাংলাদেশের শ্রম আইনকে আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, কিছু অগ্রগতি হলেও নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সমান আচরণের ক্ষেত্রে এখনো গুরুতর ঘাটতি রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে দিনে আট ঘন্টা বা সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। ওভারটাইমের মাধ্যমে এই সীমা দিনে ১০ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে, তবে বার্ষিক গড় কর্মঘন্টা ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে থাকতে হবে। একই আইনের ১০৯ ধারা অনুযায়ী, নারীর সম্মতি ছাড়া রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে তাকে কাজে নিযোগ দেওয়া নিষিদ্ধ। বাস্তবে এই সুরক্ষা অনেক সময় কার্যকর হয় না, কারণ স্বল্প আয়ের বহু নারী মনে করেন, রাতের কাজ প্রত্যাখ্যান করলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
২০২২ সালে শ্রম বিধিমালা ২০১৫ সংশোধনের মাধ্যমে কিছু অতিরিক্ত সুরক্ষা যুক্ত করা হয়। নতুন সংযোজিত বিধি ৩৬১৩-তে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি কর্মস্থলে একজন নারী প্রধান ও নারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটি অভিযোগ কমিটি গঠন, লিখিত নির্দেশনা প্রচার এবং অভিযোগ বাক্স স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব সংস্কার কর্মস্থলে এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে দীর্ঘদিনের হয়রানির সমস্যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসেছে। তবুও দুর্বন বাস্তবায়ন প্রতিশোধের ভয়, সচেতনতার অভাব এবং অকার্যকর শ্রম পরিদর্শনের কারণে বাংলাদেশ এখনো নারীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কর্মপরিবেশের দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে রাতের দায়িত্ব সংক্রান্ত হয়রানির ঘটনায় অনেক নারী অভিযোগ জানাতে সাহস পান না। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ভ্রমমান ও বহু দেশের আইন রাতের কাজকে একটি স্বতন্ত্র পেশাগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। আইএলওর নাইট ওয়ার্ক কনভেনশন, ১৯৯০ (নং ১৭১) অনুযায়ী রাতের শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত পারিশ্রমিক এবং বিশেষ মাতৃত্ব সুরক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওয়ার্কিং টাইম ডিরেকটিভ গড়ে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কর্মসীমা নির্ধারণ করে, দৈনিক ও সাপ্তাহিক ন্যূনতম বিশ্রামের নিশ্চয়তা দেয় এবং অধিকাংশ রাতের কাজকে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে প্রায় আট ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, সঙ্গে থাকে স্বাস্থ্য মূল্যায়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বিশেষ সুরক্ষা। এসব কাঠামো রাতের কাজকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও নিঙ্গসমতার বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করে।
ভিয়েতনামের শ্রম আইন গর্ভবর্তী ও দুগ্ধদানকারী নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সুরক্ষামূলক। ২০১৯ সালের শ্রম বিধি অনুযায়ী, গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে বা ১২ মাসের কম বয়সী সন্তানের দেখাশোনা করা অবস্থায় নারীর সম্মতি ছাড়া তাকে রাতের কাজ, ওভারটাইম বা দীর্ঘ ব্যবসায়িক সফরে পাঠানো যায় না। ভারী কাজে নিয়োজিত গর্ভবর্তী নারীদের হালকা কাজে স্থানারে করতে হবে অথবা কর্মঘণ্টা কসাতে হবে, তবে পূর্ণ বেতন বজায় রাখতে হবে। একইভাবে ফিলিপাইনের রিপাবলিক অ্যাক্ট ১০১৫১ রাতের কাজের ক্ষেত্রে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলেও গর্ভবর্তী নারীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা এবং সব রাতের শ্রমিকের জন্য স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিদর্শনের বিধান রেখেছে।
বাংলাদেশের শ্রমব্যবস্থা এখনো অসম্পূর্ণ, কারণ এতে রাতের কাজকে নারীদের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা প্রযোজন এমন একটি স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। নিয়োগকর্তাদের নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা, নিরাপদ অপেক্ষাকক্ষ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা গর্ভবর্তী ও দুগ্ধদানকারী রাতের শিফটের কর্মীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই আইনগত শূন্যতা নারীদের শোষণ ও অনানুষ্ঠানিক ওভারটাইমের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব ঘাটতি দূর করতে শ্রম আইনে সংশোধন এনে রাতের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা, আইএলও মানদ- অনুযায়ী শক্তিশালী নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মাতৃত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষিত পরিদর্শক, সক্রিয় অভিযোগ ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাস্তবায়ন জোরদার করা প্রযোজন। যেহেতু ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নারী রাতের কাজে নিযোজিত, তাদের নিরাপত্তা ও শোষণমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তা ও রাষ্ট্র উভয়েরই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button