কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ: উন্নয়ন বনাম নৌপথ ও পরিবেশ

কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমন্বয় ও পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। পর্যটননির্ভর এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সেই উন্নয়ন যদি নৌপথ, প্রতিবেশ ও স্থানীয় জনজীবনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে বিষয়টি গভীরভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। বাঁকখালী নদী ও মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় রানওয়ে সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে পাইলিং করে অবকাঠামো নির্মাণের ফলে চ্যানেলের নাব্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে-এমন তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটির বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীর মধ্যে পিলার স্থাপনের ফলে ¯্রােত বাধাগ্রস্ত হয়ে পলি জমছে, যা ইতোমধ্যে চ্যানেলের আড়াই কিলোমিটার এলাকায় নাব্য সংকট সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব শুধু মহেশখালী চ্যানেলেই সীমাবদ্ধ নয়; কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌরুট এবং অদূরে সোনাদিয়া দ্বীপের জনজীবনও সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো-প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নৌপথের সংরক্ষক সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর মতামত ও অনুমোদন যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। নদীর ফোরশোরে অস্থায়ী জেটি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ, রাজস্ব বকেয়া এবং পরিবেশগত সমীক্ষার অভাব-সব মিলিয়ে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও আইনি কাঠামো মানা না হলে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হয় রাষ্ট্রকেই। অন্যদিকে বেবিচকের যুক্তিও একেবারে উপেক্ষণীয় নয়। কক্সবাজার শহরে জমির স্বল্পতা এবং বিপুল বেসরকারি স্থাপনা অধিগ্রহণের জটিলতা এড়াতে সমুদ্র চ্যানেলের দিকে সম্প্রসারণকে তুলনামূলক বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পরিবেশগত ও নৌ-নিরাপত্তাজনিত প্রভাব যথাসময়ে ও পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি-এমন ধারণাই এখন জোরালো হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিআইডব্লিউটিএর সুপারিশ অনুযায়ী জলবিদ্যুৎ ও পলি পরিবহন মডেলিংসহ সমন্বিত পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে প্রকল্পের বিতর্কিত অংশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশ-এই দুইয়ের মধ্যে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি এগিয়ে নেওয়া টেকসই সমাধান নয়। কক্সবাজারের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তই পারে উন্নয়নকে সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমুখী করতে।
