সম্পাদকীয়

শেয়ারবাজারে আস্থা সংকট-কোথায় পরিবর্তনের পথ

বিদায়ী ২০২৫ সাল শেয়ারবাজারের জন্য ছিল এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার বছর। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল-অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান ঘটবে, বাজার ফিরে পাবে স্থিতি ও স্বচ্ছতা। বাস্তবে বছর শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রত্যাশার বড় অংশই অপূর্ণ রয়ে গেছে। বছরের শুরু ও শেষ-দুয়েতেই সূচকের নি¤œগতি এবং লেনদেনের খরা যেন বাজারের সার্বিক চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করছে। পরিসংখ্যান বলছে, পুরো বছরজুড়ে থেমে থেমে এবং অনেক সময় ধারাবাহিক দরপতন বিনিয়োগকারীদের পুঁজিকে ক্ষয়ে দিয়েছে। ২৫৭ কর্মদিবসের প্রায় অর্ধেক সময়ে সূচক নি¤œমুখী ছিল। নতুন কোনো কোম্পানির বাজারে না আসা ও আইপিও-শূন্য বছর হওয়া বাজারের গতিশীলতা কমে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এর সঙ্গে পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় শেয়ার শূন্য ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের ওপর বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে এসেছে-যা আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ-অনিয়মের দায়ীদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা আরোপ হলেও তা কার্যকরভাবে আদায় হয়নি; আইন ও নীতিগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আংশিক বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধ থেকেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজারের অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে দূরত্ব, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং প্রশাসনিক অকার্যকারিতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা উপেক্ষা করা যায় না। সংস্কার বলতে কেবল কিছু বিধিমালা সংশোধনকে সামনে আনা-বাজারের গভীর কাঠামোগত সংকট সমাধানে যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির প্রশ্নে কিছু বড় সিদ্ধান্তে মানবিক ও নীতিগত ভারসাম্যের ঘাটতিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ব্যাংক একীভূতকরণে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দায় সম্পূর্ণভাবে চাপিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত-এ নিয়ে যুক্তিসঙ্গত বিতর্ক রয়েছে। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় পূর্বানুমেয়তা, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীর অধিকার সুরক্ষা-এই তিনটি উপাদান নিশ্চিত করা জরুরি। তবে বছরের শেষ দিকে নির্বাচন ঘিরে ইতিবাচক প্রত্যাশার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থার বাজারে অংশগ্রহণ সূচকে সাময়িক স্থিতি এনেছে। বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনীতি ঘোষিত হবে, যা বাজারে নতুন পুঁজি ও আস্থা আনতে পারে। কিন্তু কেবল প্রত্যাশা নয়-বাস্তব সংস্কারই এই খাতে টেকসই পরিবর্তন আনতে পারে। এখন প্রয়োজন-স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণ, অনিয়মের বাছবিচারহীন প্রতিকার, বাজারের অংশীজনদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ এবং বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে কেন্দ্র করে নীতিনির্ধারণ। শেয়ারবাজার একটি দেশের অর্থনীতির ‘বারোমিটার’-এখানে আস্থা ভেঙে গেলে তার প্রভাব বিস্তৃত পরিসরে পড়ে। তাই ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীর পথচলা হোক আরও দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button