সম্পাদকীয়

খালেদা জিয়া, এক যুগের অবসান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার নাম শুধু একটি দলের নেতৃত্বের প্রতীক ছিল না, ছিল একটি সময়, একটি প্রবাহ, একটি সংগ্রামের ইতিহাস। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনীতি হারাল এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যাঁকে ঘিরে কয়েক দশক ধরে আবর্তিত হয়েছে ক্ষমতা, বিরোধিতা, আন্দোলন ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
সেনাশাসন পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় খালেদা জিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসা এই নেত্রী দ্রুতই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে। তিনি ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন, যিনি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং শক্ত হাতে দল পরিচালনা করেছেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশজুড়ে ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাত। ক্ষমতাসীন থাকা যেমন তাঁর পরিচয়ের অংশ, তেমনি বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন করাও ছিল তাঁর রাজনৈতিক বাস্তবতা। তিনি কখনো আপসের রাজনীতি করেননি, বরং কঠোর অবস্থান নিয়েই নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। এ কারণেই সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’, আর সমালোচকদের কাছে ছিলেন বিতর্কিত এক রাজনৈতিক চরিত্র।
তাঁর শাসনামল নিয়ে যেমন প্রশংসা আছে, তেমনি রয়েছে প্রশ্নও। উন্নয়ন, প্রশাসন ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে তাঁর সরকারের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে আজও আলোচনা হয়। কিন্তু এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সত্য স্পষ্ট, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী নারীর প্রতিচ্ছবি গড়ে দিয়েছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও বিরল।
দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, রাজনৈতিক চাপ ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে তাঁর শেষ সময় কেটেছে। তবুও তিনি ছিলেন রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। এমনকি মৃত্যুর আগমুহূর্তেও জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তাঁর নাম ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনা চলছিল। এটিই প্রমাণ করে, তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর ছিল।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়, এটি একটি যুগের সমাপ্তি। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব আসবে, নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে, কিন্তু খালেদা জিয়ার নাম ইতিহাসে থেকে যাবে একটি দৃঢ়, সংগ্রামী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে।
এই সম্পাদকীয় শুধু বিদায়ের নয়, স্মরণ করারও। মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও তাঁর অবদান, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে ইতিহাসের পাতায় ন্যায্য মর্যাদায় স্থান দিতে হবে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button