প্রকৌশলী সংকটে থেমে থাকা উন্নয়ন-প্রশাসনিক জটিলতা দূর হোক দ্রুত

জামালপুর জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কার্যত থমকে আছে দীর্ঘদিন ধরেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দরপত্র ও পিআইসি পদ্ধতিতে নেওয়া পাঁচ শতাধিক উন্নয়ন প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন শুরু করতে পারেনি-শুধু একটি কারণে: প্রকৌশলী সংকট। এস্টিমেট বা ব্যয় প্রাক্কলন প্রস্তুত করা সম্ভব না হওয়ায় বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের অর্থ পাচ্ছে না, বহু স্থাপনা সংস্কার বিলম্বিত হচ্ছে, আর ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। এই প্রকল্পগুলোর আওতায় জেলার বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, কবরস্থান, ঈদগাহ ও শ্মশানঘাটে ছোট পরিসরে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা হলেও এর সামাজিক গুরুত্ব ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বরাদ্দের পর চুক্তিপত্র ও কাগজপত্র জমা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে কাজ শুরু করা হয়েছে-কিন্তু অর্থ ছাড় না হওয়ায় প্রকল্প কমিটির সদস্যরা আজ সমস্যায় পড়েছেন। কেউ কেউ বেসরকারি ঋণ বা বাকিতে নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ করে কাজ এগিয়ে রেখেছিলেন; এখন তারাও অনিশ্চয়তায়। প্রশাসনিক জটিলতা যে প্রকল্প বাস্তবায়নকে কতটা স্থবির করে দিতে পারে-জামালপুর তার বাস্তব উদাহরণ। পূর্ববর্তী প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মতানৈক্য, সিদ্ধান্ত বিলম্ব এবং পরবর্তীতে প্রকৌশলী শূন্যতা-সব মিলিয়ে প্রকল্পগুলোর গতি থেমে গেছে। সহকারী প্রকৌশলী বদলি হওয়ার পর থেকে জেলা পরিষদে কোনো প্রকৌশলী নেই; সার্ভেয়ার থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলার কারণে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত নয়। ফলে এস্টিমেট প্রণয়নই সম্ভব হচ্ছে না-যা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের মূল কারিগরি ধাপ। এখানে দুটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। প্রথমত, জেলা পরিষদের মতো একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে একক কোনো কর্মকর্তা বদলি হলেই যদি পুরো উন্নয়নপ্রক্রিয়া অচল হয়ে যায়-তাহলে কাঠামোগত সক্ষমতা কতটা দুর্বল? দ্বিতীয়ত, এলজিইডি থেকে প্রকৌশলী সহায়তা দেওয়ার বিধান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন পদায়ন না হওয়া-এটি নীতি বাস্তবায়নে সমন্বয় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয় না কি? জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সাধারণত ছোট বাজেটের হলেও, এগুলো গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জরুরি প্রয়োজন পূরণে বড় ভূমিকা রাখে। কাজ বিলম্বিত হওয়ায় শিক্ষার্থী, মুসল্লি ও স্থানীয় জনগণের যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে-তা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নতুন জেলা প্রশাসক প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখালেও প্রকৌশলী সংকট দূর না হলে গতি ফিরবে না-এ কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি-দ্রুত প্রকৌশলী পদায়ন, বিকল্প ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তী কারিগরি অনুমোদন এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনা। প্রশাসনিক টানাপোড়েন বা জনবল সংকটের কারণে উন্নয়ন যেন আর বিলম্বিত না হয়-এ নিশ্চয়তা প্রদান প্রয়োজন। উন্নয়ন কেবল বরাদ্দ ঘোষণায় নয়, কার্যকর বাস্তবায়নেই অর্থবহ। জামালপুর জেলা পরিষদের প্রকল্পগুলো দ্রুত স্বাভাবিক গতিতে ফিরুক-এটাই প্রত্যাশা।
