সম্পাদকীয়

তামাকনিয়ন্ত্রণে নতুন সংশোধনী-জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর অনুমোদন আমাদের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশটি অনুমোদনের পর গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এবং অ্যান্টি-টোবাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা) সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি। তাদের মতে, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটলে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাব খাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে-যা পূর্ব অভিজ্ঞতায়ও দেখা গেছে। বাংলাদেশে তামাকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রতি বছর দেশে তামাক ব্যবহারের কারণে এক লাখ ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগ ও ফুসফুসের বিভিন্ন জটিলতা-এসব অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক ব্যবহার। এখনো দেশের ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করেন-যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। তামাকের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা যায়, তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে বছরে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে যে ক্ষতি ঘটে তার পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা-যা তামাক থেকে অর্জিত রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থনৈতিক সমীকরণটি স্পষ্টভাবে দেখায়, তামাক একটি রাজস্বনির্ভর পণ্য নয়; বরং এটি সার্বিক অর্থনীতি ও মানবসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিদ্যমান আইনকে আরও শক্তিশালী করা সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহ সৃষ্টি, ব্যবহার হ্রাস এবং জনস্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-বিশেষ করে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্যে-বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে সহায়তা করবে। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। কার্যকর প্রয়োগ, নজরদারি জোরদার, গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে তামাকের ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা-এসব দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আইন বাস্তবায়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ রাখা। তামাকনিয়ন্ত্রণ কেবল একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়-এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা, মানবসম্পদ বিনিয়োগ এবং টেকসই উন্নয়নের অংশ। সেই লক্ষ্যেই অধ্যাদেশটির দ্রুত প্রকাশ ও দৃঢ় বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button