কৃষি অনুশীলন ও নিরাপত্তা তদারকিতে সমন্বিত সংস্কার দরকার

খাদ্যে রাসায়নিক অ্যানিয়ন দূষণ
রাজশাহীর বাজারে বিক্রি হওয়া ফল ও সবজিতে অনিরাপদ মাত্রার অ্যানিয়ন শনাক্তের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় নাইট্রেট, নাইট্রাইট, ফসফেট ও ফ্লোরাইডসহ কয়েকটি রাসায়নিকের মাত্রা বিশ^স্বাস্থ্যমানের বেশি পাওয়া গেছে-যা কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের সংকেত নয়, বরং দেশের সমগ্র কৃষি ও তদারকি প্রক্রিয়ার মান পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে পাতাযুক্ত শাকসবজি ও কিছু ফলনে নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রভাব স্পষ্ট। নিবিড় কৃষি ব্যবস্থায় ফলন বাড়ানোর প্রতিযোগিতা কৃষি-পুষ্টি ব্যবস্থাপনার ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে-এমন ইঙ্গিতই উঠে এসেছে গবেষণার বিশ্লেষণে। কৃষকের উৎপাদন চাহিদা ও বাজারচাপের বাস্তবতা বোঝা জরুরি, তবে সুষম সার প্রয়োগ, মাটি ও সেচ-ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা অনুসরণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা ভোক্তার স্বাস্থ্য ও কৃষির স্থায়িত্ব-উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। স্বাস্থ্যঝুঁকি-মূল্যায়নে শিশুদের জন্য তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে নাইট্রেট-নাইট্রাইটসহ নির্দিষ্ট রাসায়নিকের অতিরিক্ত সংস্পর্শ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। যদিও ঝুঁকি সব ক্ষেত্রে সরাসরি রোগে রূপ নেয় না, তা-সত্ত্বেও এই সতর্কতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি কেবল কৃষকের সার ব্যবহারে নয়-বরং খাদ্য নিরাপত্তা শাসনের সক্ষমতায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার সরকারি কাঠামো এখনো বিক্ষিপ্ত ও সীমিত। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষাগারের অভাব, বাজারে প্রবেশের আগে বাধ্যতামূলক পরীক্ষার অনুপস্থিতি এবং একাধিক সংস্থার মধ্যে দায়িত্ববিভাজন-এসব কারণে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই শূন্যতা পূরণ না হলে বিচ্ছিন্ন গবেষণা সতর্কতা দিলেও নীতিগত প্রতিক্রিয়া দেরিতে আসে। স্বল্পমেয়াদে কৃষকদের সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সার প্রয়োগে নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ফসলের ওপর নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা জোরদার করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাইট্রেটসহ অন্যান্য অবশিষ্টাংশের জাতীয় সীমা নির্ধারণ, আধুনিক বিশ্লেষণ-পদ্ধতি ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ, কৃষি সম্প্রসারণ ও জনস্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যে সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা কেবল নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের প্রশ্ন নয়-এটি নাগরিকের আস্থা, জনস্বাস্থ্য ব্যয় এবং কৃষিখাতের টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই বিষয়টি আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মোকাবিলা করাই উত্তম। রাজশাহীর গবেষণাটি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা-এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নীতিমালা, তদারকি ও কৃষি-অনুশীলনে সমন্বিত সংস্কারই এখন সময়ের দাবি।
