মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতা ও নাগরিক ক্ষোভ

শীত মৌসুম সাধারণত মশা কমার সময়। কিন্তু এবার উল্টো চিত্র-শীতের শুরুতেই রাজধানীতে মশার দৌরাত্ম্য বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। পরিস্থিতি এমন যে, দিনের বেলাতেও মানুষ মশার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৪০০ ছাড়িয়েছে, আক্রান্ত প্রায় লাখের কাছাকাছি। অথচ মশক নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে স্পষ্ট ভাটা পড়েছে-যা নাগরিক হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক জরিপে মিরপুর, গুলশান, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় নর্দমা ও ড্রেনের পানির স্থবিরতা এবং পচনশীল পরিবেশ কিউলেক্স মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। ফলে এডিস কিছুটা কমলেও কিউলেক্স বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সপ্তাহখানেক পর এডিস কমলেও কিউলেক্সের দৌরাত্ম্য আরও কিছুদিন থাকবে। প্রকৃত সমস্যাটি শুধু ঋতুচক্র নয়; প্রশাসনিক শূন্যতা ও সমন্বয়হীনতাই বড় বাধা। জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মেয়র ও কাউন্সিলর বরখাস্ত হওয়ায় দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি, বহু জায়গায় ভারপ্রাপ্তদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আগে যেসব কাউন্সিলর পাড়ায়-পাড়ায় সচেতনতা, লিফলেট বিতরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও তদারকি করতেন-এসব কর্মসূচি এখন কার্যত অনুপস্থিত। নাগরিকরা অভিযোগ করছেন, ফগার মেশিনের কাজও নিয়মিত হচ্ছে না; আর হলেও তা কার্যকর হওয়ার মতো নয়। মশা নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি হলো ধারাবাহিকতা ও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তদারকি। অতীতে দেখা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও কাউন্সিলরদের সম্পৃক্ততা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলত। এখন সেই শূন্যতা স্পষ্ট। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা, অযতেœ থাকা লেক ও খাল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও মশা বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সিটি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আশ^াস আছে। ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, কিউলেক্স বৃদ্ধির বিষয়টি তারা জানেন এবং এলাকাভিত্তিক অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবু নাগরিক অভিজ্ঞতা বলছে, বাস্তব পরিবর্তন এখনো তেমন চোখে পড়ে না। এ অবস্থায় জরুরি প্রয়োজন-সিটি করপোরেশনগুলোর প্রশাসনিক গতি ফিরিয়ে আনা, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা। শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে মশা নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌসুমী সংকটে আটকে থাকবে। মশা নিয়ন্ত্রণ কোনো মৌসুমি দায় নয়-এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল উপাদান। তাই নগরবাসীর স্বস্তি ফেরাতে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
