সম্পাদকীয়

বিয়ের পর নারীর জীবন: সিদ্ধান্তহীনতার এক নীরব সংকট

বাংলাদেশে বিয়ে সামাজিকভাবে নতুন জীবনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সাম্প্রতিক এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দেখিয়েছে, বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ নারী এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছেন, যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মতামত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়। এই বাস্তবতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি কাঠামোগত ও সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। গবেষণায় দেখা যায়, বিয়ের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই প্রায় ৮০ শতাংশ নারী স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হন। চলাফেরা, শিক্ষা, কর্মজীবন কিংবা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত-সব ক্ষেত্রেই এই নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত। গবেষকরা যথার্থভাবেই উল্লেখ করেছেন, এই নিয়ন্ত্রণই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করে। দুই বছরের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী আর্থিক সহিংসতা এবং উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক, শারীরিক ও যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। উদ্বেগজনক হলো, খুব অল্প সংখ্যক নারীই এই সময়টিকে সহিংসতামুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনিচ্ছাকৃত ও সময়ের আগের গর্ভধারণ। বিয়ের প্রথম বছরের মধ্যেই ৭৩ শতাংশ নারী গর্ভবতী হয়েছেন, যার প্রায় অর্ধেকই ছিল তাদের ইচ্ছার বাইরে। বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকায় এই প্রবণতা আরও প্রকট। এটি স্পষ্ট করে যে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনায় নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনো অত্যন্ত সীমিত। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে নারীর শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর। বিয়ের পর শিক্ষা ও কর্মজীবন বন্ধ হয়ে যাওয়ার চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। গ্রাম ও শহরের বস্তি-উভয় এলাকাতেই অধিকাংশ নারী বিয়ের পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। সামাজিক রীতি, পারিবারিক সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক নির্ভরশীলতা নারীদের ক্রমশ ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। এই অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাই পরবর্তীতে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়-গবেষণার এই পর্যবেক্ষণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণায় বাল্যবিবাহের চিত্রও আবার সামনে এসেছে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ও পুরুষ আইনসম্মত বয়সের আগেই বিয়েতে আবদ্ধ হয়েছেন, যার বড় অংশই পারিবারিকভাবে নির্ধারিত। বাল্যবিবাহ যে নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আত্মনির্ভরতার পথে বড় বাধা-এই সত্য নতুন করে প্রমাণিত হলো। এই গবেষণা স্পষ্ট করে দেয়, বিয়ের পরের প্রথম কয়েক বছর নারীর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এই সময়ে সুরক্ষা, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার না হলে সহিংসতা, নিয়ন্ত্রণ ও অনিচ্ছাকৃত মাতৃত্বের এই চক্র ভাঙা কঠিন। নারীর অধিকার কাগজে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button