সম্পাদকীয়

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি

এলপিজি সংকট

এলপিজি সংকট কেবল বাজারের ওঠানামার সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর নীতিগত ব্যর্থতা, যেখানে পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের ঘাটতি একসঙ্গে মিলে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে কাগজে-কলমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ফলে ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উভয়েই এক অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশে গ্যাস সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে সীমিত। শহর ও মফস্বলের বিপুল জনগোষ্ঠী রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। শীতকালে পাইপলাইনের গ্যাসের ঘাটতি আরও প্রকট হয়, আর তখন এলপিজি হয়ে ওঠে একেবারে অপরিহার্য। কিন্তু এই অপরিহার্য জ্বালানির সরবরাহে যখন অনিয়ম, দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়, তখন তা শুধু ভোক্তার ভোগান্তি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসনিক অভিযানের ফলে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে, যা আবার গোপন বিক্রির মাধ্যমে দ্বিগুণ দামে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও টিকে থাকতে পারছেন না। সংকটের আরেকটি দিক হলো সরবরাহ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া। ব্যবসায়ীদের সংগঠন জানিয়েছে, দেশে কোটি কোটি সিলিন্ডার থাকলেও রিফিল হচ্ছে অল্প কয়েকটিতে। বহু কোম্পানি কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেছে এবং একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিনির্ধারণে অংশীজনের মতামত উপেক্ষা করার প্রবণতা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নতুন দর ঘোষণাকে অনেকেই বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মনে করছেন। নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া না থাকলে তার ফল ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে। এই সংকটের সামাজিক প্রভাবও গুরুতর। রাজধানীর চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁ পর্যন্ত এলপিজিনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয় বলে অনেকেই দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে কর্মসংস্থান কমছে, জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। অর্থাৎ এলপিজি সংকট কেবল রান্নাঘরের সমস্যা নয়, বরং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সমাধানের পথ খুঁজতে হলে কেবল দমনমূলক অভিযান নয়, বরং সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি। জরুরি ভিত্তিতে আমদানি ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, একই সঙ্গে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ন্যায্য কমিশন নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক নজরদারি থাকতে হবে, তবে তা যেন বাজারকে অচল না করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এলপিজিকে একটি কৌশলগত জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা। পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের বাস্তবতা মাথায় রেখে এলপিজিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবার শীতকালে একই সংকট ফিরে আসবে এবং জনজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button