দেশ সেরা খুলনার মুহাম্মদনগর স্কুলের শিক্ষার্থীদের কষ্টের শেষ নেই

# কান্না জড়িত কণ্ঠে বিদায় নিলেন সহকারী শিক্ষক
# শ্রেষ্ঠ স্কুলের উন্নয়ন ফাইল ৪ বছর আটকে আছে অজানা কারণে
আনিছুর রহমান কবির ঃ খুলনা উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পর যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সারাদেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৭টি ক্যাটাগরির মূল্যায়নে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে খুলনার গর্ব ও শিক্ষার্থীদের প্রাণের স্পন্দনে পরিণত হয়েছে—সেই স্কুলটির শিক্ষার্থীরা আজ কান্নাজড়িত কণ্ঠে নানা আকুতি জানাচ্ছে। দেশসেরা সেই বিদ্যালয়টিতে নেই পর্যাপ্ত খেলার ব্যবস্থা। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শিক্ষার চাপ বাড়লেও বাড়েনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে এখনো পর্যন্ত দেশসেরা হয়ে উঠতে পারেনি স্কুলটি। ক্লাসরুমের অভাবে শিশুদের গাদাগাদি করে বসে পাঠ গ্রহণ করতে হচ্ছে। জমির অভাবে একাডেমিক ভবন সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণের ফাইল প্রায় চার বছর ধরে আটকে আছে।এ নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ। অভিভাবক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, “দেশসেরা মুহাম্মদনগর স্কুলের জমি অধিগ্রহণের ফাইলটি দীর্ঘ চার বছর ধরে আটকে আছে। ফাইল ছাড়াতে কী লাগে, সেটা আমরা সবাই জানি। একটি দেশসেরা স্কুলের জন্যও যদি দুর্নীতি, অনিয়ম আর ফাইলবন্দি দশা কাটে না, তাহলে আমরা কার কাছে যাব? আমাদের বাচ্চাগুলো খুব কষ্টে এখানে পড়াশোনা করে।” অভিভাবক পূর্বাশা জামান উর্মী বলেন, “স্কুলটি আমাদের গর্ব। এই গর্বকে পুঁজি করে অন্যরা সুবিধা নেয়, আর খেটে মরে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকরা। অথচ স্কুলটির শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে যে অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, তা সরকারিভাবে না দিলে একদিন হয়তো এই শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়ে যাবে। আমরা চাই স্কুলটি সহকারী শিক্ষক এম এম ইমদাদ আলী স্যারের মতো শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই বিদায় নিক।” সহকারী শিক্ষক এম এম ইমদাদ আলী-এর বিদায় অনুষ্ঠানে মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ক্ষুদে শিক্ষার্থী ইংরেজিতে বক্তব্য দেয়। বক্তব্য শেষে সেই শিক্ষার্থী বলে, “আমরা খুব কষ্টে লেখাপড়া করি। আমাদের স্কুলে আরও কিছু বিল্ডিং হলে ভালো হতো। শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক, কিন্তু সেই তুলনায় সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। আমরা ওপরের স্যারদের বলব—আমাদের স্কুলটিকে আরও উন্নত অবকাঠামো দিন, আমাদের ঝরে পড়া থেকে মুক্ত করুন।” অপরদিকে, বিদ্যালয়টি শুরুর সময় থেকেই যে শিক্ষকটি আগলে রেখেছিলেন এবং এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পেছনে যাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, সেই সহকারী শিক্ষক এম এম ইমদাদ আলী-এর বিদায় অনুষ্ঠানে তৈরি হয় হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চোখে দেখা যায় অশ্রু। স্মৃতিচারণে উঠে আসে নানা দুঃখ-কষ্ট আর সংগ্রামের গল্প। খুলনা শহরের গর্ব, সারাদেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃত মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এম এম ইমদাদ আলী এই বিদ্যালয় থেকেই তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন এবং একই বিদ্যালয় থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে অবসর গ্রহণ করেন। তবে বিদ্যালয়টিকে শ্রেষ্ঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান ময়না সহ এই শিক্ষকের ছিল অক্লান্ত পরিশ্রম ও অসামান্য অবদান। উল্লেখ্য, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় অবস্থিত মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০২৪ সালের ২৭ জুন সারাদেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে নির্বাচিত হয়। মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান ময়না বলেন, “স্কুলটি দেশসেরা হলেও এখনো পর্যন্ত অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে দেশসেরা হতে পারিনি। জমির অভাবে বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই। ক্লাসরুমের অভাবে শিশুদের গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে। জমির অভাবে একাডেমিক ভবন সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণের ফাইল প্রায় ৪ বছর ধরে আটকে আছে।” তিনি আরও বলেন, “দ্রুত জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।” তিনি জানান, বিদ্যালয়ের এই কৃতিত্ব কেবল একজনের নয়; বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ম্যানেজিং কমিটি, জেলা ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই বিদ্যালয় আজকের এই অবস্থানে এসেছে। তবে আজ বিদ্যালয়ের এক সহযোদ্ধার বিদায়ে যেন সবার বুকটাই কেঁদে উঠছে। বিদায় অনুষ্ঠানে এছে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে খুলনা-১ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব আমীর এজাজ খাঁন বলেন, আমি নির্বাচিত হতে পারলে মোহাম্মদনগর স্কুলের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে যা যা করণীয় সবকিছুই করব। কারণ এই স্কুলটি শুধুমাত্র দেশ সেরা নয়, স্কুলটি আমাদের বটিয়াঘাটা এলাকার গর্ব । এ সময় বিদায় অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ও ১নং জলমা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আশিকুজ্জামান (আশিক)



