এলপি গ্যাসের সংকট কাটছেনা : জনদুর্ভোগ চরমে!

# সংকটে পড়ে সিলিন্ডার পেতে লাগছে দীর্ঘ সময়, ক্ষুব্ধ ক্রেতারা #
# গ্যাস না পেয়ে ইলেকট্রিক ও কাঠের চুলার দিকে ঝুঁকছেন ভুক্তভোগীরা #
# নাগরিক নেতারা বলছেন : সংকট তৈরী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই #
মো. আশিকুর রহমান : সারা দেশের ন্যায় খুলনায়ও তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট এখন চরমে, ফলে খুলনা মহানগরীতে গ্যাস ব্যবহারকারীরা চরম দুর্ভোগ ও হতাশার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই সংকট নানা উদে¦গের পরও স্বস্তি ফেরাতে ব্যার্থ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সুশীল সমাজের ব্যাক্তিবর্গ। ভুক্তভোগীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের প্রতি দ্রুত সময়ের মধ্যে বর্তমান সময়সহ আসন্ন রমজানের আগেই এই সংকট দূরীকরণে বাস্তবমুখি উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহনের আহ্বান জানিয়েছেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, সারা বাংলাদেশে যে কয়টি তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) কোম্পনী রয়েছে, তার মধ্যে হাতেগোনা মুষ্টিমেয় কয়েকটি কোম্পানী বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছে। এলপিজি কোম্পনীর মধ্যে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো,ওমেরা, নাভানা, আই গ্যাস, বিএম, পেট্রোবাংলা, সান গ্যাস, ফ্রেশ, জেএমআই, বেঙ্গল, জি-গ্যাস, ইউনি,দুবাই-বাংলা, ডেল্টাসহ আরো বেশ কিছু কোম্পানী বিদ্যমান রয়েছে। যাদের অধিকাংশের এলপিজি বাজারে সরবরাহ নাই। যে কারনে সম্প্রতি এলপিজি’র এই সংকট আরো তীব্রতর আকার ধারন করেছে, গ্যাসের সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দরের অধিক দর দিলেও সংকট থেকেই যাচ্ছে। একদিকে সংকট, অন্যদিকে নির্ধারিত দামের পর বাড়তি দামেও সংকটের মুখে এলপিজি ব্যবহারকারীরা। সংকটের মুখে পড়ে আবাসিক বাসা-বাড়ী, ব্যবাসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো রান্না-বান্নার কাজে চরম দুর্ভোগ পাহাচ্ছেন। যেহেতু এই সংকট দীর্ঘদিনের তাই, সাময়িক স্বস্তি পেতে বিপরীত রাস্তা অবলম্বনে অনেকেই ইলেকট্রিক ও মাটির চুলার দিকে ঝুঁকছেন। ভুক্তভোগী গ্যাস ব্যবহারকারিরা জানান, সরবরাহ না থাকায় গত সপ্তাহ থেকে বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার প্রতি মূল্য বৃদ্ধি কমপক্ষে ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কিছু অসাধু খুচরা ব্যবসায়ীরা আরও বেশি দাম হাঁকাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগীদের। বর্তমানে কিছু দোকানে কয়েকটি কোম্পানির অল্পসংখ্যক গ্যাস সিলিন্ডার মিললেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। নাগরিক নেতা বলছেন, সংকট তৈরী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, এটা দেখভালের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সরকারের নীর্তি নির্ধারকদের। সংকট তৈরী হলে তার নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বও তাদের। আমাদানির সংকট, বানিজ্যিক কারনে ব্যবাসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে চাইলে পুলিশি ব্যবস্থা আছে, ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিতে সংশ্লিস্টদের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তারা সর্তক নন, তারা নিরব ভূমিকায়। পাশাপাশি যদি আমদানির সংকট থাকে, তবে সরকারকে তা দূরীকরনে পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিৎ, কোনো অবস্থাতেই জনগনের ভোগান্তি সৃষ্টি করা উচিৎ নয়। পরিবেশকগন বলছেন, লিকুইড সরবরাহ সংকটের কারনে বাজারে সরবরাহ কমেছে এলপিজি’র। খুচরা ব্যবাসায়ীরা বলছেন, এই জটিলতা দীর্ঘদিনের। মাঝেমধ্যে দু’একটা কোম্পানী দু’চারটা গ্যাস দেয়, ব্যবসা করা দায় হয়ে পড়েছে। ব্যবহারকারীরা বলছেন, চুলাই ভালো ছিল। গ্যাস কোম্পানীগুলো আমাদের নিয়ে তামাশা শুরু করেছে। আজ এই কোম্পানীর গ্যাস নেই তো কাল ওই কোম্পানী গ্যাস নেই। কারণ জানতে চাইলে কেউ সঠিক ব্যাখা দেয় না। বুঝিনা! লিকুইড নাই, নাকি দাম বাড়ানোর সিন্ডিকেট। সংশ্লিষ্টদের প্রতি ভোক্তারা দাবি তুলেছেন, বাজারে চাহিদামতো নিয়মিত গ্যাস সরবরাহসহ দাম নিয়ন্ত্রণের। সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ দিকে এ সংকটময় পরিস্থিতি কেটে যাতে পারে। সূত্রটি বলছে, বেসরকারি খাতে এলপিজির একক নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে মাসে এক লাখ টনের বেশি ধারন ক্ষমতার একটি এলপিজি রিফিল স্টেশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। দ্রুতই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা। সূত্রে আরো জানা গেছে, দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টনের বেশি। এছাড়া তিতাসের সরবরাহ সিস্টেমেও গ্যাস ছিল না। অপারেটরদের সূত্রে জানা গেছে, সরকারের অনুমতি পাওয়ার পর অনেক ব্যবসায়ী এলপিজির আমদানির এলসি খুলেছেন। তারা আমদানি শুল্ক কমানোরও দাবি করেছেন। তানিয়া নামের গৃহিনী জানান, গ্যাসের চুলা ব্যবহারের পর থেকে বসুন্ধরা কোম্পানী গ্যাস ব্যবহার করতাম। কিছুদিন পর দেখি তাদের গ্যাস সংকট। পরে অন্য কোম্পানীর গ্যাসও সংকট। গতকাল দোকানে ১০ বার গেছি, শুনি গ্যাস আসে নাই। আর কবে আসবে, সে ব্যাপারেও দোকানদাররা বলতে পারে না। ভারি বিপদে আছি, তাই বিপদে পড়ে আরো একটি ইলেকট্রিক চুলা কিনে এনেছি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিনা আক্তার জানান, গ্যাসের চুলায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘুগনি বেচি। গতকাল গ্যাস শেষ হয়ে গেলে দ্রুত দোকানে গিয়ে দেখি গ্যাস নেই। পরে বাসা থেকে মাটির চুলা নিয়ে আসি। আগেই ভালো ছিলাম, চুলাই ভালো। টাকা দিয়েও গ্যাস মিলছে না। হোটেল ব্যবসায়ী কুদ্দুস মিয়া জানান, ভাত বিক্রি করি। সপ্তাহে একটা গ্যাস লাগে। গত পরশুদিন গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। যে গ্যাস গত সপ্তাহে ১৩৫০ টাকায় কিনেছি, সেটি কিনলাম ১৫০০ টাকা দিয়ে। মজার ব্যাপার দোকানে গিয়ে দেখি ৪/৫ জন ক্রেতা দাঁড়িয়ে আছে, দোকানদার কাকে রেখে কাকে দেবে বিপদে পড়েছে। বর্তমানে টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। গেলেও কয়েকদিন বা কয়েক ঘন্টা পরে। খুচরা গ্যাস ব্যবসায়ী শাহ আলম জানান, বেশ কিছু কোম্পানীর গ্যাস বিক্রি করি। গত কয়েক মাস ধরে ঠিকঠাক গ্যাস পাই না। আজ এ কোম্পানীর আছে, কাল ওই কোম্পানীর নেই। এ ব্যবসা করতে এসে মহা বিপদে আছি। টাকা বিনিয়োগ করে কত টাকাই বা লাভ করি, তারপর আবার বাড়িতে বাড়িতে ডেলিভারি দিতে গেলে রিক্সা ভাড়াটা পর্যন্ত দিয়ে দেওয়া লাগে। সময়মত গ্যাস দিতে না পারলে ক্রেতাদের সাথে সুসম্পর্ক থাকছে না। গ্রাহক মো. হুমায়ূন কবির জানান, টাকাও গ্যাস মিলছেনা। গত সপ্তাহে গ্যাস আনতে গিয়ে ছিলাম, দোকানদার স্পষ্টভাষায় বলে দিলো গ্যাস সাপ্লাই না। গ্যাস না পাওয়া গেলেও আর রান্না-বান্না বন্ধ থাকবে, তাই বিকল্প হিসাবে স্ত্রীকে কাঠের চুলায় রান্না করতে বলেছি। প্রশ্ন, এ সংকট কবে কাটবে এবং সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হবে। এ বিষয়ে এম. আলম গ্রুপের অপারেশন হেড মো. আক্তারুজ্জামান জানান, বাংলাদেশের প্রতিটি এলপিজি কোম্পানীরই লিকুইড সংকট চলছে। এগুলো যেহেতু বিদেশ থেকে আমদানি হয়, পর্যাপ্ত সরবরাহ নাই। যতটুকু শুনতে পেরেছি এ কারনেই সংকট। ডিসেম্বরের শেষে থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বন্ধ। শুনেছি চলতি মাসের শেষ দিক হতে হয়তোবা চাহিদানুসারে সরবরাহ হতে পারে। এ বিষয়ে এলপিজি বেক্সিমকোর পরিবেশক শেখ শাকির আহম্মেদ জানান, ডিসেম্বর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সরবরাহ বন্ধ। বিশ^ বাজারে গ্যাসের সংকট। শীতের সময়ে বিশ^ বাজারে গ্যাসের সংকট থাকে, প্রতিবছর এই একই চিত্র থাকে। আসন্ন ঈদুল ফিতর পর্যন্ত এ সংকট যেতে পারে। প্রতিবছরই মার্চ মাস পর্যন্ত এ সংকট চলতে থাকে, এরপর ঠিক হয়ে যায়। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র সাঃ সম্পাদক এড.কুদরতই খুদা জানান, সংকট তৈরী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, এটা দেখভালের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সরকারের নীতি নির্ধারকদের। সংকট তৈরী হলে তার নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বও তাদের। আমাদানির সংকট, বানিজ্যিক কারনে ব্যবাসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হতে পারে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে চাইলে একটা পুলিশি ব্যবস্থা আছে, ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিতে সংশ্লিস্টদের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তারা সর্তক না, তারা নিরব ভূমিকায়। পাশাপাশি যদি আমদানির সংকট থাকে, তবে সরকারকে তা দূরীকরনের পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিৎ, কোনো অবস্থাতেই জনগনের ভোগান্তি সৃষ্টি করা উচিৎ নয় বলে আমি মনে করি। বসুন্ধরা এলপিজির পরিবেশক ও খুলনা এলপিজি গ্যাস ডিলার ওনার্স এসোসিয়েশন’র যুগ্ম-সম্পাদক ও মো. জাহিদুর রহমান ওয়াসিম জানান, সমগ্র বিশ^জুড়ে এলপিজি পরিবহনের জন্য যে কয়টি মাদার ভাসেল আছে, তার মধ্যে স্যাংশন পরবর্তী যে কয়টি উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় সচল আছে, তাদের সিডিউল পেতে বিলম্ব হচ্ছে। তাছাড়া সংকট কাটিয়ে উঠতে লিকুইড আমদারির ক্ষেত্রে এলসি করার যে জটিলতা আছে, সরকারের উচিৎ কিভাবে এটার দ্রুত সমাধান করা যায়। সরকার ও কোম্পানীর নীতি নির্ধারকরা যে সিধান্ত জানান, সেটিই জানতে পারি। গত ডিসেম্বরের শেষে দিকে কিছু গ্যাস সরবরাহ হয়েছে, এরপর এখন পর্যন্ত সরবরাহ বন্ধ আছে। হয়তোবা এ মাসের শেষে দিকে এলপিজি’র সরবরাহ শুরু হতে পারে। এ বিষয়ে খুলনা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষনের বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম জানান, আমরা খুলনা বাজারের সার্বিক বিষয়ে নিয়মিত তদরকি করে থাকি। ব্যবসার আইনবহির্ভূত কাজের জরিমানাও আদায় করা হচ্ছে। এলপি গ্যাসের সংকটের বিষয়টি শুনেছি, এর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখবো। আইনবহির্ভূত কোনো কর্মকা- পরিচালত হলে ব্যবস্থা নেব।



