বিশ^বিদ্যালয়ে নিয়োগ: স্বচ্ছতা ও আস্থার প্রশ্ন

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় একযোগে ১৫৩ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ঘটনা। বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে জনবল নিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত ৪৪ জন শিক্ষক নিয়োগের মধ্যে দুই উপ-উপাচার্যের নিকটাত্মীয়ের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও আত্মীয় হওয়া নিজেই অযোগ্যতার প্রমাণ নয়, তবু পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ন্যূনতম সন্দেহের অবকাশ থাকাও প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর। এখানে যোগ্যতা ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা যতই বজায় থাকুক না কেন, স্বার্থের সংঘাত এড়াতে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রত্যাশিত। বিশ^বিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘দেখতে নিরপেক্ষ’ হওয়াও যেমন জরুরি, তেমনি ‘বাস্তবে নিরপেক্ষ’ হওয়াও অপরিহার্য। নিয়োগ বোর্ডে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আত্মীয় থাকলে সেই প্রক্রিয়া থেকে তাঁদের সম্পূর্ণভাবে সরে দাঁড়ানো-এ ধরনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চর্চা আস্থা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, একই সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির দায়ে এক প্রার্থীকে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা এবং মদ্যপ অবস্থায় ধরা পড়া দুই কর্মচারীকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্যোগ হিসেবেই দেখা যায়। বিশেষ করে পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে এখানে প্রশ্ন ওঠে-যেখানে অনিয়মে কঠোরতা দেখানো হচ্ছে, সেখানে নৈতিক দ্বন্দ্বপূর্ণ বিষয়ে একই মাত্রার সংবেদনশীলতা কি বজায় থাকছে? আরেকদিকে, পূর্বের অভিযোগ পুনর্বিবেচনায় নতুন রিভিউ কমিটি গঠন প্রশাসনের স্বচ্ছতার আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তবে তদন্ত ও রিভিউ কমিটি যেন কেবল সময়ক্ষেপণের প্রক্রিয়ায় পরিণত না হয়, সেদিকেও নজর জরুরি। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ^াসযোগ্য সিদ্ধান্তই পারে প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে। সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো দেখায়-একদিকে শৃঙ্খলা ও নিয়ম মানার চেষ্টা, অন্যদিকে আস্থার সংকট। এই সংকট কাটাতে হলে কেবল নিয়ম মেনে চলাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক উচ্চতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যত বেশি স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত হবে, ততই সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা সুদৃঢ় হবে।
