মামলা-চার্জশিট-নিষেধাজ্ঞা সবই আছে- তবু বেনাপোল বন্দরে চলছে চাঁদাবাজি

যশোর ব্যুরো : মামলা আছে, চার্জশিট আছে, নিষেধাজ্ঞাও ছিল তবু বেনাপোল স্থলবন্দরে ফের প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন সুমন হোসেন। অভিযোগ উঠেছে, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং বিভিন্ন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের মামলার নথি অনুযায়ী, সুমন দীর্ঘদিন ধরে বেনাপোল বন্দরে পাসপোর্ট দালালি ও চাঁদাবাজি করে আসছিলেন। কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাসপোর্ট যাত্রীদের লাইনের বাইরে দ্রুত ভারতে পাঠানোর কথা বলে জনপ্রতি ২–৩ হাজার টাকা আদায় করতেন। একই সঙ্গে বন্দরের শেড ইনচার্জ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা বেনাপোল বন্দরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) শাহিদা শারমিন ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বেনাপোল পোর্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় ১০ সেপ্টেম্বর যা নিয়েই শুরু হয় প্রশ্ন। মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল চার্জশিট দাখিল করে। অথচ চার্জশিট দাখিলের পরও আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ আইনের এই শিথিলতার সুযোগ নিয়ে সুমন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
ঘটনাকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা বেনাপোল বন্দরের কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিরা আগেই অভিযোগ করেছিলেন, সুমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দিতেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর প্রচারণা চালাতেন এবং এমনকি একবার তৎকালীন চেয়ারম্যানকে গেস্টহাউসে অবরুদ্ধও করেছিলেন। এমনকি তার কাস্টম হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও জারি হয়েছিল।তবু আজ প্রশ্ন নিষেধাজ্ঞা, মামলা ও চার্জশিটের পরও তিনি কীভাবে আবার চাঁদাবাজির মাঠে ফিরলেন?
ঘটনাকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা বন্দর পরিচালক রেজাউল ইসলাম গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে অবসরে আছেন) মো.জিল্লুর রহমান বেনাপোল বন্দর পরিদর্শনে এলে সুমন দলবল নিয়ে বন্দরের গেস্টহাউস ঘেরাও করে তাকে কার্যত আটকে রাখেন যা একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নজিরবিহীন দুঃসাহস।
স্থানীয় ব্যবসায়ী বলছেন, চাঁদাবাজ সুমন হোসেন আবারও সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছেন। বেনাপোল বন্দরের আশপাশে বিভিন্ন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা দাবি করছেন তিনি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি, মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর ভয় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
বেনাপোল আমদানি রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, এটা এখন আর দালালি না, এটা প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। মামলা আর চার্জশিটের পরও যদি একজন চিহ্নিত অপরাধী এভাবে বন্দরে ঘুরে বেড়ায়,তাহলে আমরা ব্যবসা করবো কীভাবে? সুমন আমাদের সরাসরি জিম্মি করছে। লাখ টাকা, দুই লাখ টাকা খোলাখুলিভাবে দাবি করছে। আইন যদি কাজ না করে, তাহলে অপরাধীর সাহস বাড়বেই। তিনি আরও বলেন, যারা তাকে এতদিন ধরে রক্ষা করছে, তাদের নামও সামনে আসা দরকার। না হলে বেনাপোল বন্দর পুরোপুরি চাঁদাবাজদের হাতে চলে যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়িরা বলেন, চার্জশিটের পরও সুমন গ্রেপ্তার না হওয়াটা কি কেবল অবহেলা, নাকি ইচ্ছাকৃত? কার ছত্রচ্ছায়ায় একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে ফের দাপট দেখাচ্ছে?
এবিষয়ে বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বন্দরের সহকারি পরিচালক শাহিদা শারমিন সুমন হোসেনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত শেষে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, গত বছর বন্দরের সহকারি পরিচালক শাহিদা শারমিন অভিযোগের ভিত্তিতে সুমন নামে একজনের নামে থানায় মামলা করেন। এখন আসামি আটক করা বা না করা থানা পুলিশের দায়িত্ব। এখন থেকে বন্দরের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা নিয়মিত নজরদারি করছি। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



