মঞ্জুতে নির্ভর বিএনপির রেকর্ড ভাংতে চায় জামায়াত

বিএনপির দুর্গদখলে নিতে চায় জামায়াত
পরিক্ষিত, সৎ ও জনবান্ধব অভিভাবক চায় ভোটাররা
স্টাফ রিপোর্টার : দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের প্রাণকেন্দ্র খুলনার-২ আসনটি বরাবরই আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে থাকে। অফিস আদালত বিশ^বিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূণ্য ব্যবসা প্রতিষ্টান এই আসনের সীমানার মধ্যে পড়ায় প্রতিবারই জাতীয় নির্বাচনে টক অব দ্যা টাউন থাকে, কে হবেন এই আসনের অবিভাবক। আসনটিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামিসহ ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ¦ন্দ্বীতা করবেন। তবে আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। অতীত নির্বাচনের দিকে নজর বুলালে আসনটি থেকে সর্বাধিকবার বিজয়ী হয়েছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। তবে এবারের নির্বাচন ঘিরে কোন প্রার্থীর নির্ভার থাকার সুযোগ নেই বলে অভিমত সচেতন নাগরিকদের।
খুলনা-২ আসন :
খুলনা-২ আসন সোনাডাঙ্গা ও খুলনা সদর নিয়ে গঠিত। জাতীয় সংসদের ১০০ নম্বর আসন খুলনা-২। খুলনা জেলা নির্বাচন অফিসের চলতি বছরের নভেম্বর মাসের তথ্য মতে, এ আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩১ হাজার নয়শত ৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৪ হাজার ১২২, নারী ভোটার ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৩ ও হিজড়া ভোটার ১০ জন। আসনটিতে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫৭ টি।
খুলনা-২ আসনে প্রার্থী যারা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দলের প্রার্থী খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খুলনা মহানগরী আমির মুফতি আমানুল্লাহ এবং খেলাফত মজলিসের মুফতি মোঃ শহিদুল ইসলাম। ইসলামি দলগুলোর জোট প্রার্থী নির্ধারণ না হওয়ায় জামায়াতে ইসলামি ও ইসলামি আন্দোলনের প্রার্থী রয়েছে আসনটিতে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিগত ৩টি বিতর্কিত নির্বাচনসহ মোট ৪ বার এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। বিগত দিনে এ আসনে বিএনপিরই প্রাধান্য ছিল বেশি। যে কারণে এ আসনকে বিএনপির দূর্গ বলা হয়। এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য পরিচ্ছন্ন ও বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে প্রার্থী ঘোষণা করে চমক দেখিয়েছে। তাকে প্রার্থী করায় অনেকটা নির্ভার নেতাকর্মীরা। তবে জুলাই বিপ্লবের পর অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অতীতে এই আসনটিতে জামায়াত কখনো না জিতলেও এবারের নির্বাচনে তারা চমক দেখাতে চায়। সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলালকে প্রার্থী করে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তারা।
প্রার্থীরা যা বলছেন : মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বলেন, দুঃসময়ের দিনগুলোতে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, ত্যাগ ও শ্রমের কারণে দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি উপহার দিতে চাই।
নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন বিষয়ে মঞ্জু বলেন, শিল্প নগরী খুলনার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করবো। কলকারখানাগুলো চালু করে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে।
জলাবদ্বতা ও মাদক এই শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা। জলবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন যে পরিকল্পনা নিয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। আমরা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা হাতে নেবো। শান্তির নগরী খুলনা খুনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এসব হত্যাকান্ডের মূলে রয়েছে মাদক। তরুণ সমাজকে বাঁচাতে জনগণকে সাথে নিয়েই মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করবো।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির জন্য আমরা কাজ করছি। প্রতিদ্বন্দ্বী যেসব দল রয়েছে তাদের সাথে আমরা একসাথে কাজ করেছি। আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য আমরা সবাই একসাথে কাজ করবো। তরুণ প্রজন্মসহ এ আসনের জনগণ বিএনপিকেই ভোট দেবে বলে আমি আশাবাদি।
অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল বলেন, গ্যাস লাইন নিয়ে আমরা কাজ করবো। কারণ শিল্পনগরী খুলনার পুরোনো পরিচয় ফিরিয়ে আনতে হলে সেগুলো চালু করতে হবে। এজন্য গ্যাস সংযোগ অত্যন্ত জরুরী। খুলনা মাদকের অভয়ারণ্য পরিণত হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ করবো। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান থাকবে জিরো টলারেন্স। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে আমরা প্রতিষ্ঠানিক মোটিভেসনের ব্যবস্খা করবো। খুলনার আগামী প্রজন্মকে আমরা এমনভাবে গড়তে চাই যেন তারা খুলনার জন্য গর্বের হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে আমরা একসাথে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। সামনের দিনে তাদের সাথে কাজ করতে অসুবিধা হবেনা। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, সারা দেশে জামায়াতে ইসলামির প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। আমরা আশাবাদি জামায়াত সরকার গঠন করবে। সারা দেশে জামায়াতের প্রতি মানুষের যে সমর্থন সেটার প্রভাব এখানের জনগণের মধ্যেও আছে। খুলনা-২ এর জনগণ আমাদের সমর্থন দেবে বলে আমি মনে করি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খুলনা মহানগরী আমির মুফতি আমানুল্লাহ বলেন, আমি যদি নির্বাচিত হই আমাদের প্রধান পদক্ষেপ হবে খুলনা শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো। করোনাকালিন সময়ের পাশাপাশি নানা সংকটে ইসলামি আন্দোলনের নেতাকর্মীরা নগরবাসিকে সেবা দিয়েছে। আমি নির্বাচিত হই বা না হই নগরবাসির পাশে থাকবো।
জনগণ ভোট হাতপাখায় দেয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা দূর্নীতির সাথে যুক্ত নই। এজন্য মানুষ আমাদের ভোট দেবে বলে বিশ^াস করি।
কি ভাবছেন ভোটাররা ঃ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সুষ্টুভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে তারা প্রার্থী নির্বাচনে গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসবেন। বেছে নেবে সৎ,যোগ্য ও জনবান্ধব প্রার্থীকে।
এ আসনের ভোটার রকিবুল জানান, এবার ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে পরিক্ষিত সৎ, দুর্নীতিমুক্ত, জনবান্ধব প্রার্থীকে ভোট দেবো। যিনি আমাদের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেবেন। শান্তির শহর খুলনাকে আবার শান্তির জায়গায় ফেরাতে পারবেন।
খুলনা-২ আসনের বিগত নির্বাচনের ফলাফল : স্বাধীনতার পর খুলনা-২ আসনে আওয়ামী লীগ ১৯৭৩, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে জয় পেয়েছে। এরমধ্যে ১৯৭৩ সাল বাদ দিলে বাকি তিনবারই বিতর্কিত নির্বাচন।
১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের শেখ আব্দুর রহমান, ১৯৭৯ সালে বিএনপির শেখ সালেহ মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মো. মহসিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ রাজ্জাক আলী (মৃত) বিএনপির টিকিটে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচন করে বিজয়ী হন। এরপর তার ছেড়ে দেওয়া আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মহানগর বিএনপির তৎকালীন মহানগর আহবায়ক আলী আসগর লবী।
আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু ৯০ হাজার ৯৫০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মিজানুর রহমান মিজান পেয়েছিলেন ৮৯ হাজার ২৮০ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ১ হাজার ৬৭০। ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের মিজানুর রহমান মিজান। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বঙ্গবন্ধুর ভাতিজা ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল বিজয়ী হন।


