সম্পাদকীয়

সড়কে শিশুমৃত্যু: অবহেলার মূল্য কতদিন?

সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সাল বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক গভীর উদ্বেগ ও বেদনার অধ্যায় হয়ে রইল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যমতে, এক বছরে সারাদেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন মানুষ। আহত হয়েছেন আরও ১৬ হাজারের বেশি। এই পরিসংখ্যান নিজেই ভয়াবহ। তবে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য হলো-এই নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৮ জন শিশু। শিশুদের এই বিপুল প্রাণহানি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের সড়ক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। পরিসংখ্যান বলছে, নিহত শিশুদের প্রায় অর্ধেকই ছিল পথচারী। অর্থাৎ তারা গাড়ি চালাচ্ছিল না, বরং রাস্তা পার হতে গিয়ে কিংবা রাস্তার পাশে চলাচলের সময় প্রাণ হারিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, আমাদের সড়ক এখনো শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। বিশেষ করে আঞ্চলিক সড়কগুলোতে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়। থ্রি-হুইলার, নসিমন-ভটভটি, বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক-এই যানবাহনগুলোর সঙ্গে শিশু মৃত্যুর সম্পর্ক আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার অনিয়ম, নিয়ন্ত্রণহীনতা ও দায়িত্বহীনতার চিত্র তুলে ধরে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অদক্ষ চালকদের হাতে যানবাহনের চাবি থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ির অবাধ চলাচল এবং অতিরিক্ত গতি-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়ভিত্তিক দুর্ঘটনার ধরণ। দুপুর ও সকালের ব্যস্ত সময়ে শিশু মৃত্যুর হার বেশি হওয়া প্রমাণ করে, স্কুলগামী ও দৈনন্দিন চলাচলরত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ হওয়াও বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। এই প্রেক্ষাপটে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সুপারিশগুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, শিশুবান্ধব সড়ক পরিকল্পনা, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার-এসব উদ্যোগ আর কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিঃসন্দেহে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শিশুদের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্র, পরিবহন খাত ও সমাজ-সবার সমন্বিত দায়িত্ববোধ এখন সময়ের দাবি। প্রশ্ন একটাই-আর কত প্রাণ হারালে আমরা সত্যিকার অর্থে নিরাপদ সড়কের পথে হাঁটব?

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button