সম্পাদকীয়

নির্বাচন ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা; গণতন্ত্রের পরীক্ষার মুহূর্ত

বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভয় ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। ভোট দেওয়ার পর রাতে নিরাপদে ঘুমাতে পারবেন কি না-এই প্রশ্ন যদি কোনো নাগরিককে ভাবতে হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত নীতি সংলাপে বিশিষ্টজনদের বক্তব্য আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে, নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এখনও উপেক্ষিত বাস্তবতা। গণতন্ত্রের মূল শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে নয়, বরং সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহানের বক্তব্য যথার্থ-নাগরিককে যদি নিজের দেশেই নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে থাকতে হয়, তবে অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে। ভোটাধিকার প্রয়োগ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের ইশতেহারে সংখ্যালঘু অধিকার, অন্তর্ভুক্তি ও সমতার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের তাগিদ হারিয়ে যায়। ড. বদিউল আলম মজুমদারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ মাত্র; নির্বাচনের পর রাজনৈতিক আচরণই বলে দেয় রাষ্ট্র কতটা সভ্য ও গণতান্ত্রিক। এই সংলাপে উঠে আসা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সংখ্যালঘু বলতে কেবল ধর্মীয় পরিচয় নয়; এর মধ্যে আদিবাসী, তৃতীয় লিঙ্গ, যৌন ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষ, নারী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও অন্তর্ভুক্ত। হো চি মিন ইসলামের বক্তব্য সমাজের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে-মৃত্যুর পরও পরিচয়ের কারণে মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হওয়া একটি গভীর মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে আদিবাসী ও অবাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি সংখ্যালঘু নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় দল জিতুক বা হারুক-ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষই। অতীতের সহিংস ঘটনার বিচার না হওয়া ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর বার্তা দেয়। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকারে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা শুধু একটি অনুচ্ছেদ হিসেবে নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য, সময়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক পরিকল্পনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নির্বাচনের আগে ও পরে কঠোর নজরদারি এবং অপরাধের দ্রুত বিচার-এসব পদক্ষেপ ছাড়া আস্থা ফিরবে না। সংখ্যালঘুরা যদি সত্যিই নিরাপদ বোধ করেন, তবেই বলা যাবে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে। অন্যথায় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার রদবদলের আয়োজন হয়েই থেকে যাবে, নাগরিকের অধিকার নয়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button