মূল্যস্ফীতির চাপে নীতির পরীক্ষা

২০২৫ সালের শেষ দিকে এসে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, টানা দুই মাস বাড়ার পর ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। যদিও পুরো বছরের গড় মূল্যস্ফীতি আগের বছরের তুলনায় কমে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশে নেমেছে, বাস্তবতায় ভোক্তার স্বস্তি এখনও স্পষ্ট নয়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি পুরো বছরজুড়েই ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। বছরের শুরুতে তা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা কমলেও শেষদিকে আবার বাড়তির দিকে গেছে। এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত উদ্যোগ আংশিক সফল হলেও তা এখনও স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামের ভিন্ন গতি। বছরের শুরুতে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলেও এপ্রিলের পর থেকে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম তুলনামূলক দ্রুত বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি যেখানে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ, সেখানে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে তা ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, জ্বালানি ও সেবাখাতের ব্যয় ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। গ্রাম ও শহরের মূল্যস্ফীতির মধ্যে বড় ব্যবধান না থাকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়-মূল্যস্ফীতির চাপ এখন সার্বজনিক। এটি কেবল শহুরে মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়; গ্রামীণ অর্থনীতিও সমানভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী জুনের মধ্যে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কেবল মুদ্রানীতির কঠোরতা যথেষ্ট হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইন, প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনিক নজরদারিতে দৃশ্যমান উন্নতি জরুরি। ভোক্তা সংগঠনগুলোর বক্তব্যে উঠে এসেছে আরেকটি বাস্তবতা-সুশাসনের ঘাটতি। চাঁদাবাজি, কারসাজি ও দুর্বল বাজার তদারকি নিত্যপণ্যের দামে অনাকাক্সিক্ষত চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে চালসহ কয়েকটি মৌলিক পণ্যে কার্যকর নজরদারির অভাব পুরো বছরজুড়েই ভোক্তাকে ভুগিয়েছে। মূল্যস্ফীতি কেবল অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত। আয় না বাড়লে মূল্যস্ফীতির প্রতিটি শতাংশ সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তব সংকট হয়ে ওঠে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগ, বাজারে শৃঙ্খলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে, ভোক্তার স্বস্তি আদৌ ফিরবে কি না।
