সম্পাদকীয়

নিরাপত্তা সংকট ও গণতন্ত্রের সংযোগ

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদের উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই উদ্বেগ যে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যে। তাদের মূল অভিমত এক জায়গায় এসে মিলেছে-দেশের নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে গণতান্ত্রিক ঘাটতি ও রাজনৈতিক অনৈক্য। সম্প্রতি কারওয়ান বাজারে আয়োজিত ‘আঞ্চলিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা যে বিষয়টি জোর দিয়ে বলেছেন, তা হলো একটি অংশগ্রহণমূলক, বিশ^াসযোগ্য ও তৃণমূলভিত্তিক নির্বাচন ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। ‘ম্যানেজড’ বা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সাময়িক স্থিতি আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়ায়-কারণ এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনী, আরও বেশি রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়। বিশ্লেষকদের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে এসেছে-গত দেড় দশকে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে বাহিনীগুলোর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা যথার্থই সতর্ক করেছেন, এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হবে। আলোচনায় আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও বৈদেশিক ঝুঁকির কথাও গুরুত্ব পেয়েছে। উজানে নদীর পানি বণ্টন, আঞ্চলিক শক্তির কৌশলগত অবস্থান, ‘চিকেন নেক’ ঘিরে আলোচনা-এসবই ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা আঞ্চলিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একই সঙ্গে অপতথ্য ও তথ্যযুদ্ধকে ভবিষ্যতের বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ। তবে আলোচনার একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করা-বিশ্লেষকদের মতে-রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এই ধারা বজায় রাখাই হতে পারে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে, জাতীয় নিরাপত্তা কেবল অস্ত্র, বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাজেটের বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক ঐকমত্য, গণতান্ত্রিক চর্চা, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে চায়, তবে প্রথম শর্ত হবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়া। নিরাপত্তার প্রশ্নে এর কোনো বিকল্প নেই।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button