দায়িত্ব পেলে জনগণের সম্পদে আমরা হাত দেব না : ডা. শফিকুর রহমান

চাঁদাবাজদের হাতেও কাজ তুলে দিতে চাই
প্রবাহ রিপোর্ট : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, অতীতের কোনো সরকারই দাবি করতে পারবে না যে, তাদের শাসনামলে দুর্নীতি হয়নি, জনগণের সম্পদ লুট হয়নি, ব্যাংক ডাকাতি হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতি যদি আমাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে, তাহলে আল্লাহর কসম— আমরা জনগণের সম্পদের ওপর হাত দেব না। আমরা জনগণের চৌকিদার হয়ে আমানত হেফাজত করব।’
সোমবার দুপুরে মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতায় গেলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে দেওয়া হবে না। প্রতিবছর আয়-ব্যয়ের হিসাব জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। চাঁদাবাজদের পুনর্বাসন নয়, বরং তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। যাতে কেউ আর চাঁদাবাজিতে জড়াতে বাধ্য না হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত মনোনীত ও ১০ দল সমর্থিত মেহেরপুর-১ আসনের প্রার্থী মাওলানা মো. তাজউদ্দীন খান এবং মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনের প্রার্থী মো. নাজমুল হুদার সমর্থনে এ জনসভার আয়োজন করা হয়।
সোমবার মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি : বাসস
সোমবার মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি : বাসস
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, মেহেরপুর একটি ছোট জেলা, মাত্র তিনটি উপজেলা। এখানে মানুষ মানুষকে চেনে। অথচ এই জেলাও চাঁদাবাজদের দখলে চলে গেছে। জনগণের রায়ে আমরা ক্ষমতায় গেলে এই মানুষগুলোর দায়িত্ব নেব, তাদের কাজ দেব, যাতে তারা আর চাঁদাবাজিতে জড়াতে না হয়।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, আর ‘না’ মানে গোলামি। আমাদের প্রথম ভোট হবে ‘হ্যাঁ’ ভোট। সবাই যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করে, তাহলে দেশ বিজয়ী হবে। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। কেউ ভোট ডাকাতি করতে চাইলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
গত ৫৪ বছরের শাসকদের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই দীর্ঘ সময়ে দেশে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তরুণ সমাজ মাদক ও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের জন্য আমাদের মায়া হয়। দায়িত্ব পেলে দেশকে ফুলের মতো সাজাবো, যাতে মানুষ দেশ নিয়ে গর্ব করতে পারে।
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাঁদাবাজি করব না, দুর্নীতি করব না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয়ও দেব না। মানুষ ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে কাকে ভোট দেবে।’
বেকার ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা বেকার ভাতা দেব না। ভাতা দিলে বেকারত্ব কমে না, বরং বাড়ে। আমরা ভাতা নয়, কাজ দেব।
তিনি আরো বলেন, তরুণদের শক্তিতেই দেশ এগিয়ে যাবে। সেই লক্ষ্যেই যুব সমাজকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
জনসভা শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির মেহেরপুরের দু’টি আসনের প্রার্থীদের হাতে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন এবং উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সহযোগিতা কামনা করেন।
জনসভায় মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মো. তাজউদ্দীন খানের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও গাংনী উপজেলা জামায়াতের আমির মো. নাজমুল হুদা, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, কেন্দ্রীয় অধিকার পরিষদের সেক্রেটারি আমিরুল ইসলাম, এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সোহেল রানা এবং জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. ইকবাল হোসাইনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
চাঁদাবাজদের উদ্দেশ্য করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা তোমাদের হাতেও কাজ তুলে দেব। আমরা কোনো বেকার ভাতা দেব না। বেকার ভাতা দিয়ে আমরা বেকারের মহাসমুদ্র তৈরি করতে চাই না। তোমরা যারা এসব কর্মকা-ে লিপ্ত আছ। সেদিন সম্মানের সাথে তোমরা বসবাস করবা, এখন তো তোমরা অপমানজনক ভাবে এই সমাজে বসবাস করো। মানুষ তোমাদের ঘৃণা করে, মানুষ তোমাদের অভিশাপ দেয়।
সোমবার দুপুর পৌনে ১২টায় কুষ্টিয়া শহরের শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে ১১দলীয় নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
দখলবাজ ও চাঁদাবাজদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, এই ভাইদের প্রতি আমরা বলতে চাই, সত্যিই যদি আপনাদের সংসারের অভাব-অনটনের কারণে আপনার এই কাজগুলো করে থাকেন, আসুন আপনারা এখান থেকে সরে আসুন, আল্লাহ আমাদের যে রিজিক দিয়েছেন, ওইটাই আপনাদের সাথে আমরা ভাগাভাগি করে খেতে রাজি আছি। তবুও মানুষকে কষ্ট দিবেন না, চাঁদাবাজি করবেন না।
জামায়াতের আমির বলেন, এখানে কুষ্টিয়া জেলায় ৬০টার মতো রাইস মিল (অটো রাইস মিল) আছে, চাল কল আছে। ট্রাকগুলো এখান থেকে চাল বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। এখানে প্রতিটি ট্রাক থেকে বেসরকারি খাজনা আদায় করা হয়। চাঁদা বললে মানুষ একটু লজ্জা পায়, তাই বেসরকারি খাজনা বললাম। এবং রেটও (চাঁদার) ভালো প্রতি ট্রাকে ৫ হাজার টাকা। এতে ট্রাকের মালিকরা অতিষ্ঠ, ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ, চালকল মালিকরাও অতিষ্ঠ। এরপরে আবার বিভিন্ন স্ট্যান্ড দখলের ব্যাপার আছে। আমি আবশ্য স্ট্যান্ডের নাম নেই না, ওটা নিলে আবার মন খারাপ করে একদল মানুষ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সবাইকে বলি ওখান থেকে সরে আসুন। আমরা কথা দিচ্ছি, এমন এক বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি, আল্লাহ পরে ভরসা করে, যে বাংলাদেশের প্রত্যেক সক্ষম পুরুষ এবং নারীর হাতে মর্যাদার কাজ আমরা তুলে দেবো ইনশাল্লাহ। বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের হাতে, তাদের এই যৌবনের শক্তি দিয়ে, তারা যেন দেশকে দারুণভাবে গড়তে পারে, এগিয়ে নিতে পারে।
এরআগে সকাল ১০টায় শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে ১১ দলীয় নির্বাচনি জনসভা শুরু হয়। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ও কুষ্টিয়া- ২ আসনে ১১ দলীয় প্রার্থী আব্দুল গফুর।
এছাড়াও জনসভায় বক্তব্য রাখেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, জাগপার কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেলা সভাপতি, এবি পার্টির জেলা কমিটির যগ্ম সম্পাদকসহ কুষ্টিয়ার চারটি আসনে জামায়াত প্রার্থীরা।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সুজা উদ্দিন জোয়ার্দ্দারের পরিচালনায় আমন্ত্রিত অতিথিসহ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীসহ ৬০/৭০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


