মাদক থেকে রক্ষা করতে হবে

বিপথগামী হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের তরুণ প্রজন্মের ওপর। অথচ সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণা আমাদের সামনে যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো- মাদক ব্যবহারকারীদের বড় অংশই কৈশোরে, অর্থাৎ ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এ পথে পা বাড়াচ্ছে। এ বাস্তবতা আমাদের সমাজের জন্য এক অশনিসংকেত। মাদক সমস্যার ভৌগোলিক বিস্তারও চিন্তার বিষয়। ঢাকা বিভাগে আসক্তির হার সর্বাধিক, তবে সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও বড় শহরগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে। একসময় মাদককে শহুরে সমস্যা বলা হতো, কিন্তু এখন তা দ্রুত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। বন্ধুবান্ধবের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি- এসব কারণ তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে এটি আর শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং একটি গভীর সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মাদক সরবরাহ বন্ধে অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু চাহিদা কমানোর উদ্যোগ এখনও দুর্বল। চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার ঘাটতি বহু বছরের পুরোনো সমস্যা। একজন মাদকাসক্তকে অপরাধী হিসেবে নয়, অসুস্থ মানুষ হিসেবে দেখা জরুরি। তার প্রয়োজন চিকিৎসা, সহমর্মিতা এবং সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির সুযোগ। এ কারণে সরকারের উদ্যোগে ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে এটি যথেষ্ট নয়; আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। মাদকবিরোধী লড়াইকে কেবল পুলিশের অভিযান বা আইনি শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সামাজিক সংগঠন- সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের জন্য বিকল্প বিনোদন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- বাড়াতে হবে, যাতে তারা সুস্থ জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়। একইসঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা প্রচারণা জোরদার করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদক সমস্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়; এটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে আঘাত করছে। তাই প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পুনঃঅন্তর্ভুক্তি- এই চারটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় কৌশল গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে নীতি গ্রহণ এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এই লড়াই সফল হবে না। যুবসমাজকে রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে এখনই সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন শুরু করতে হবে। সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই- কারণ প্রতিটি দিন আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
