সম্পাদকীয়

টেকসই উন্নয়নে বড় চ্যালেঞ্জ

জলবায়ু পরিবর্তন

বাংলাদেশ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের অর্থনীতি ও সমাজকে ক্রমাগত চাপের মুখে ফেলছে। কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য- সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে বসতভিটা হারিয়ে শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এতে নগরায়ণ আরও জটিল হয়ে ওঠে, বাড়ে বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বাড়ছে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ। ঢাকা শহর ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং নানা জটিল রোগ বাড়ছে। নদীগুলো শিল্পবর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বনভূমি ধ্বংসের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যেমন জরুরি, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে কার্যকর নীতি গ্রহণও অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব শিল্পনীতি, নদী ও বন সংরক্ষণ- এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা জোরদার করা প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে জনগণের সচেতনতা। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তোলা জরুরি। পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, বৃক্ষরোপণ- এসব ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের সমস্যা নয়; এটি এখনই আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। তাই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ- এই তিনের সমন্বয় ছাড়া জলবায়ু সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ বারবার প্রমাণ করেছে, সংকট মোকাবিলায় তার সক্ষমতা আছে। এবারও যদি আমরা সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবা থেকে দেশকে রক্ষা করে একটি টেকসই ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button