নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও অর্থের বাস্তবতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত প্রতিশ্রুতির তালিকা দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়। চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা, কর ও ভ্যাট কমানো, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখা, বিনা খরচে চিকিৎসা, সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ কিংবা কোটি কোটি কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার-সব মিলিয়ে ভোটারদের সামনে এক ধরনের আশাবাদী চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির ব্যয় বছরে লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীও একাধিক ব্যয়বহুল সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। অথচ এসব কর্মসূচির অর্থ কোথা থেকে আসবে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়। দলগুলো মূলত সামাজিক নিরাপত্তা খাতের পুনর্বিন্যাস ও দুর্নীতি বন্ধের মাধ্যমে অর্থ সাশ্রয়ের কথা বলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে কাঠামোগত সংস্কার ও দক্ষতা বাড়াতে পারলে এই ধরনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। তবে বাস্তবতা হলো-নতুন সরকারকে বিপুল বৈদেশিক ঋণের দায় নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে। ঋণ পরিশোধের চাপ, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার প্রেক্ষাপটে একযোগে এত বড় ব্যয়ের কর্মসূচি চালু করা সহজ হবে না। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা খাত থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ‘সাশ্রয়’ করার যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। দুর্নীতি কমানো অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেটি তাৎক্ষণিকভাবে শত শত কোটি টাকা মুক্ত করে দেবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে কর ও ভ্যাট কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর তত্ত্ব অর্থনীতিতে পরিচিত হলেও, এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শক্তিশালী প্রশাসন প্রয়োজন, যা কয়েক মাসে অর্জনযোগ্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরস্পরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশও লক্ষ্যণীয়। এতে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল নীতিগত নয়, রাজনৈতিক বিতর্কের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-এই প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং দায়বদ্ধতা। ইতিবাচক দিক হলো, প্রায় সব দলই কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি নীতিগত অগ্রাধিকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে নির্বাচনী ইশতেহার যদি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে এসব প্রতিশ্রুতি ভোট শেষে হতাশায় রূপ নিতে পারে। অতএব, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব শুধু বড় স্বপ্ন দেখানো নয়; বরং স্বচ্ছভাবে জানানো-কীভাবে, কোন সময়ে এবং কোন অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। নইলে উন্নয়ন ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি কাগজেই থেকে যাবে, বাস্তবে নয়।
