জাতীয় সংবাদ

ইসিতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জামায়াত-বিএনপির

প্রবাহ রিপোর্ট : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটের পরিবেশ ও আচরণবিধি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি। রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করে তারা এ অভিযোগ জানান।
বিএনপির অভিযোগ-নির্বাচনে বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় একটি দল শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার নামে শান্তি কমিটি গঠন করা হবে, এমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে। এছাড়া ভোটের প্রচারে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং গত এক দেড় বছরে ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর ভোটার স্থানান্তর হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এছাড়া ভোটের কাজে বিএনসিসি না রাখা ও ভোটের আগে বহিরাতদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকা- ও সহিংসতার ঘটনা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে বড় বাধা বলে মনে করে দলটি। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তারা।
রোববার সকালে নির্বাচন ভবনে সিইসির সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। বৈঠক শেষে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) এর ক্যাডেটরা ছাত্র। তাদের নির্বাচনের কাজে প্রথমবারের মতো যুক্ত করার সিদ্ধান্ত আমরা শুনেছি। এটা এখনও চূড়ান্ত কিছু হয়নি হয়ত। আমরা জেনে দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে বলেছি- ইয়াং, ছাত্র তাদেরকে সংসদ নির্বাচনের মতো জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা ঠিক হবে না। আমরা জানতে পেরেছি-এটা যদি করা হয় তাহলে বলা হবে স্কাউটদেরকেও যুক্ত করা হোক। এর কদিন পর বলা হবে গার্লস গাইডদের যুক্ত করা হোক। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বলে আইনে যাদেরকে উল্লেখ রয়েছে, তাদেরকে নির্বাচনের কাজে রাখা উচিত। তারা (ইসি) আমাদের কথার যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশ্বস্ত করেছে ইসি। তিনি বলেন, কোনো কোনো দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার নামে শান্তি কমিটি গঠন করা হবে, এমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে। শান্তি কমিটি শব্দটাই আমাদের কাছে অপ্রিয় শব্দ, যদিও শান্তিবাদী মানুষ। ইসি বলেছে, তাদের এ সম্পর্কে জানা নেই এ ধরনের কমিটি করার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, গত এক দেড় বছরে ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর ভোটার স্থানান্তর হয়েছে। বিশেষ বিশেষ এলাকায় অনেক নতুন ভোটার হয়েছে, যেটা অস্বাভাবিক। এ বিষয়ে ইসি জানিয়েছে এরকম বেশি হয়নি, কোনো আসনে দুই-তিন হাজারের বেশি হয়নি। তাদের কথায় সন্তুষ্ট হতে পারিনি। নজরুল ইসলাম বলেন, নিশ্চিত জানি, ইসিকে যারা তথ্য সরবরাহ করেছে সঠিক তথ্য দেয়নি। প্রকৃত পক্ষে অনেক বেশি ভোটার মাইগ্রেশন হয়েছে। আসনভিত্তিক ভোটার মাইগ্রেশনের তথ্য জানতে চেয়েছি, তারা এটা দেখবেন। এদের মধ্যে সন্দেহ করার মতো থাকলে ইসির উচিত ব্যবস্থা নেওয়া। এমন হোল্ডিং নম্বর, যেখানে ৪/৫ জনের বেশি বসবাস করে না, সেখানে ২০-৩০ জন ভোটার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন বলেছে তারা তদন্ত করবে। হয়ত হোল্ডিং নম্বর নেই, কিন্তু ভোটার রয়েছে। এগুলো মন্দ লোকেরাই করছে। যারা ভোটার আইডি-বিকাশ নম্বর নিয়ে কেলেঙ্কারি করেছে, তারাই হয়ত ভুয়া ভোটার বা ভোটার মাইগ্রেশনে জড়িত। ইসির ভূমিকা দরকার। নজরুল ইসলাম খান অরও বলেন, আমরা এটাও বলেছি যে এমন সব নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, যেগুলো শুধু আইন অমান্য বা আইন ভঙ্গই নয়, আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগকে আহত করা হচ্ছে। অথচ এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। যেমন আমরা দেখেছি, কেউ কেউ কোনো দলের পক্ষে বক্তৃতা করছেন যে কবরে চারটি প্রশ্ন করা হয়। আমরা যারা মুসলমান, আমরা সবাই জানি যে আসলে তিনটি প্রশ্ন করা হয় তোমার ধর্ম কী, তোমার রব কে এবং তোমার নবী কে? আচরণবিধি প্রতিপালনের বিষয়ে বিচারিক অনুসন্ধান কমিটিকে তাদের কর্মকা- আরো দৃশ্যমান করার বিষয়ে জোর দেন তিনি। অভিযোগের পাশাপাশি ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে বহিরাগতদের নির্বাচনি এলাকা ছাড়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বিএনপি। দলের নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, ইসিকে অবহিত করেছি, নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তাদের নির্বাচনি এলাকার বাইরে অন্য নির্বাচনি এলাকায় কাজ করছে। আইনে এটা বাধা নেই, করতে পারে। তবে তারা যেহেতু স্থানীয় নয়, তাদের চেনে না-তারা যেন নির্বাচনের দুদিন আগে, তারা যেন সে এলাকায় না থাকে, এবং সেখানে থেকে নির্বাচনি কর্মকা-ে বিশৃঙ্খলার সুযোগ না দেয়- সেটা আমরা অনুরোধ জানিয়েছি।

নজরুল ইসলাম বলেন, এবার দেশি ৮১টি সংস্থার ৫৫ হাজারেরও বেশি পর্যবেক্ষক অনুমোদন দিয়েছে ইসি। এর মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আছে, তেমন পরিচিত নয়। তাদের নামে অনেক পর্যবেক্ষক দেখেছি। অভিযোগ নেই, ইসিকে বলেছি তারা বিষয়টা গভীরভাবে বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নাকি সাধারণ প্রক্রিয়ায় হয়েছে। তারা বিষয়টি বিবেচনা করবেন। পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে যাদের তাদেরই পযবেক্ষণই করা উচিত। একসঙ্গে বেশি পর্যবেক্ষক গিয়ে নির্বাচনি কর্মকা- যেন ব্যাহত না হয় সে বিষয়ে সচেতন থাকার জন্য ইসিকে বলা হয়েছে।
এদিকে বিএনপির পর এদিন বিকালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নেতৃত্বে ৬ সদস্যর প্রতিনিধিদল সিইসির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে দলটির নারী প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর ‘শান্তি কমিটির’ বিষয়ে সাংবাদিকরা এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব আজগুবি অভিযোগ কোনো সুস্থ মাথা থেকে আসতে পারে না। আমি বলবো, কোনো সুস্থ লোক, সুস্থ কোনো দল এ ধরনের অভিযোগ করতে পারে না। তিনি দাবি করেন, একটা দল অস্থির হয়ে যায়, জনগণের যে বিপুল সমর্থন আমাদের দিকে পুরুষ-মহিলা সবার সমর্থন, এগুলোতে ভীত হয়ে তারা এ সমস্ত কথাবার্তা বলছেন। এটা সুস্থতার কোনো লক্ষণ আমার কাছে মনে হচ্ছে না। আমরা তাদের সুস্থতার জন্য দোয়া করি। ঢাকায় হাদি ও শেরপুরের রেজাউল হত্যাকা- ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ও শান্তিপূর্ণ ভোটে ‘মারাত্মক অন্তরায়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিএনপির নানা অভিযোগের বিষয়ে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, একটি দল সব সময় ‘না’ এর পক্ষে। সব কিছুতে না। এটা জনগণই বিবেচনা করবেন। গণভোটেও ‘না’ ছিল, এখন হয়ত ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে এসেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নারী উইংয়ের প্রধান হাবিবা চৌধুরী বলেন, দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৫০ শতাংশ নারী। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। তাঁর দাবি, আসন্ন নির্বাচন নারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি ‘গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে’ নারীদের ভয় দেখিয়ে ভোট থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন জেলায় জামায়াত সংশ্লিষ্ট নারী কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১৫টি ঘটনার তথ্য তারা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ৩ দফা দাবিতে ইসিতে মানববন্ধন : এদিকে মাঠপর্যায়ে যাতায়াত-খাবার ভাতা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভবনের সামনে রোববার মানববন্ধন করেছে ইলেকশন অবজারভার সোসাইটি (ইওএস)। মানববন্ধন শেষে সংগঠনের নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। ইওএস-এর নেতারা জানান, এবারের নির্বাচনে কমিশন সারাদেশে প্রায় ৫৫ হাজার স্থানীয় পর্যবেক্ষকের তালিকা অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে তাদের অধীনেই রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার পর্যবেক্ষক। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য বড় বাজেট থাকলেও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক সহায়তা না থাকাকে তারা ‘বৈষম্যমূলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এসময় পর্যবেক্ষকদের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি তোলা হয়। এগুলো হলো-মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষকদের জন্য ন্যূনতম যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার ব্যয় নির্বাহে জরুরি তহবিল বরাদ্দ করা। দায়িত্ব পালনকালে কোনো ধরনের বাধা বা আক্রমণকে বেআইনি ঘোষণা করে দ্রুত পরিপত্র জারি করা ও অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা নিরসনে আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং অফলাইনে পরিচয়পত্র ও স্টিকার সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।
দেশে পৌঁছেছে দেড় লক্ষাধিক ‘পোস্টাল ব্যালট’ : এদিকে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটদান সম্পন্ন করে ব্যালট বাংলাদেশে পাঠানো শুরু করেছেন প্রবাসিরা। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টা পর্যন্ত ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৮টি পোস্টাল ব্যালট বাংলাদেশে এসেছে পৌঁছেছে। আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সালীম আহমাদ খান এ তথ্য জানিয়েছেন । তিনি জানান, ভোট দিতে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করা ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ জন প্রবাসী ভোটারের ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২০ হাজার ৫০১ জন প্রবাসী ভোটার ব্যালট গ্রহণ করেছেন। ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪ জন। প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৭৬২টি পূরণকৃত ব্যালট সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিস বা ডাকবাক্সে জমা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৮টি ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে। তিনি আরো জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিতে দেশে ও প্রবাসে মিলিয়ে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তর থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪২ জন ভোটার। তাদের মধ্যে আইনি হেফাজতে থাকা ভোটার রয়েছেন ৬ হাজার ২৪০ জন। গত ২৬ জানুয়ারি থেকে দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হয়েছে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত ৫ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৮টি পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button