সরকার জনআকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ: টিআইবি

প্রবাহ রিপোর্ট : অফুরন্ত সুযোগ থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে অন্তর্বতী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সংস্কারের দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ থাকলেও হয়নি। বর্তমানে নির্বাচনেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডতৈরি হয়নি। বরং অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্মের ব্যবহার হচ্ছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কনফারেন্স রুমে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ছিলেন-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা ও নির্বাহী ব্যবস্থাপক প্রফেসর সুমাইয়া খায়ের, ডিরেক্টর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি মোহাম্মদ বদিউজ্জামান, ডিরেক্টর রিসার্চ ফেলো শাহাজাদা আকরাম ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জুলকার নাইন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নজিরবিহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অসামান্য অর্জন। রাষ্ট্র সংস্কার, নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হলেও তা হয়নি। উপদেষ্টারা সরকার গঠনের শুরুতে সম্পদের হিসাব দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেটি এখন পর্যন্ত দেননি। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বহুবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অন্তর্বতী সময়ে সরকার বিচার, সংস্কার, নির্বাচন, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত নিলেও এবং রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের অবকাঠামো তৈরি হলেও তা পর্যাপ্ত শক্তিশালী হয়নি। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি যতুটুক মজবুত হতে পারতো ততটুকু হয়নি। এ ভিত্তির ওপর রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তব সুফল অর্জনের পথে ইতোমধ্যে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে প্রবল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত বছর সারা দেশে মোট ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১০২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনের মধ্যেই দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবলের মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বড় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে; যা নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে ডিপফেক ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার হুমকিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পর্যবেক্ষণে। পর্যবেক্ষণে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংশয় ও মতবিরোধের কথা বলা হয়েছে। জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্র্নিধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারে অনুপযোগী রয়েছে। ইলেকশন কমিশন কর্তৃক প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ৭৩টি পর্যবেক্ষক সংস্থার অনেকগুলোই নামসর্বস্ব বা সক্ষমতাহীন বলে পর্যবেক্ষণে বলা হয়। প্রার্থীর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে হলফনামায় দাখিল করা তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা ও ব্যবহার নিয়েও ঘাটতির কথা বলা হয়। টিআইবির নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে আচরণবিধি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের শক্ত অবস্থানের ঘাটতি রয়েছে। পর্যবেক্ষণে নির্বাচন ও গণভোট উভয় ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি, আইন ও প্রক্রিয়াগত বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুল বা অপতথ্য ছড়ানোর আশঙ্কা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে বলা হয়, বর্তমান সরকার ধারন করেনি বা ধারন করতে চাইনি মিডিয়া স্বাধীনভাবে কাজ করুক। রাষ্ট্রের ভেতর ও রাষ্ট্রের বাইরে থেকে মিডিয়াকে চাপে রাখা হয়েছে। নজিরবীহিনভাবে প্রথম আলো ডেইলি স্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। বর্তমানে মিডিয়া এক প্রকার ভীতিকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।



