সম্পাদকীয়

গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত

অপতথ্যের ছড়াছড়ি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বাস্তব রাজনীতির চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভার্চুয়াল জগৎ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-নির্মিত ভুয়া ভিডিও, বিকৃত ছবি ও মিথ্যা বক্তব্যে ভরে গেছে ফিড। এসব কনটেন্ট জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং নির্বাচনি পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। ইউএনডিপির ই-মনিটর প্লাস প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৮৬ হাজারের বেশি এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে-যা প্রমাণ করে অপপ্রচারের মাত্রা কতটা ভয়াবহ। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার এখন আর কেবল কারিগরি উৎকর্ষের বিষয় নয়, বরং এটি এক সুপরিকল্পিত ‘ডিজিটাল সন্ত্রাস’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।এসব কনটেন্টের বড় অংশই রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক ও হিংসাত্মক। ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে এগুলো ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তা বন্ধ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়া। এটি নির্বাচন কমিশনের কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অক্ষমতাকে প্রকাশ করে। যদিও ইসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করছে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চিঠি দিচ্ছে, পরিস্থিতির ভয়াবহতার তুলনায় এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত অপ্রতুল।নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করে প্রার্থীর চরিত্র হনন বা গুজব ছড়ানো দ-নীয় অপরাধ। কিন্তু হাজার হাজার কনটেন্টের বিপরীতে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। শুধু ‘তদন্ত চলছে’ বা ‘চিঠি দেওয়া হয়েছে’ ধরনের মন্তব্য দিয়ে দায় এড়ানো এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়।এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের উচিত আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করা। বিটিআরসি, এনটিএমসি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিটের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘র‌্যাপিড রেসপন্স সেল’ গঠন জরুরি, যারা ২৪ ঘণ্টা আপত্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করে দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি মেটা বা এক্সের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশের নির্বাচনের সংবেদনশীলতা বুঝতে বাধ্য করতে হবে এবং তাদের অ্যালগরিদম যেন কোনোভাবেই এআই-জেনারেটেড বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।ভুলে গেলে চলবে না, নির্বাচন মানে শুধু ব্যালট পেপার আর ভোটকেন্দ্র নয়; এটি জনগণের আস্থার প্রতিফলন। এআইর অপব্যবহারের মাধ্যমে সেই আস্থার মূলে যদি আঘাত হানে, তবে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়বে। নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির এই দানবকে রুখতে না পারলে ডিজিটাল অপতথ্যের কাছে হার মানবে প্রকৃত জনমত। ভোটগ্রহণের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসিকে তার পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি শক্তি প্রয়োগ করে এই ডিজিটাল নৈরাজ্য বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে-এটাই প্রত্যাশা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button