সম্পাদকীয়

ব্যাংক জালিয়াতির অন্ধকারে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ঘিরে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার নগ্ন উদাহরণ। দিনমজুর, ভ্যানচালক, কৃষক কিংবা শয্যাশায়ী অসহায় মানুষের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ সৃষ্টি করে তা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা রাষ্ট্রীয় তদারকির বিশ^াসযোগ্যতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন শাখা থেকে শতাধিক দরিদ্র মানুষের নামে ঋণ দেখিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণ করে, এ ধরনের জালিয়াতি একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এতে ব্যাংকের শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ, এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির ঘাটতিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধানে অর্থের গতিপথ বিশ্লেষণ করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে-যা ব্যাংকিং খাত ও রাজনীতির অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কের পুরোনো আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, যাদের নামে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি হয়েছে, তারা কেউই এর কোনো সুবিধাভোগী নন। বরং ঋণের নোটিশ তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে-পরিবার ভাঙন, মানসিক বিপর্যয়, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে এ মানুষগুলো স্পষ্টতই ভুক্তভোগী। তাদের ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করা শুধু অন্যায় নয়, মানবিকতার পরিপন্থীও। এ ঘটনায় দুদকের মামলা, বিএফআইইউর তদন্ত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়-এই জালিয়াতি বছরের পর বছর চলল কীভাবে? ঋণ অনুমোদনের আগে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, গ্রাহকের সক্ষমতা যাচাই ও নথিপত্র পর্যালোচনার মতো মৌলিক প্রক্রিয়া উপেক্ষিত হওয়ার দায় কার? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা কেন সময়মতো সতর্ক হতে পারেনি, সে প্রশ্নেরও সন্তোষজনক উত্তর প্রয়োজন। এই কেলেঙ্কারি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তরিক কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। এছাড়াও যেসব দরিদ্র মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তাদের একটি স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য। নতুবা এ ধরনের কেলেঙ্কারি বারবার ফিরে এসে অর্থনীতি ও সমাজ-উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button