সম্পাদকীয়

উদ্বেগ ছড়াচ্ছে নিপাহ ভাইরাস

দেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে নিপাহ ভাইরাস। প্রতিবছর শীতের সময় এলে এই ভাইরাস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কারণ এসময় এর সংক্রমণ বাড়ে। কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার কারণে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকে। এই ভাইরাসের উৎস মূলত বাদুড়। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল ভালো ফলের সঙ্গে মিশে থাকলে সেখান থেকেও ছড়াতে পারে এই ভাইরাস। আক্রান্তের ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক বা অন্যান্য জিনিসপত্র থেকেও হতে পারে সংক্রমণ। সাধারণ ভাইরাস জ্বরের মতো উপসর্গ হলেও নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার ৫০-৬০ শতাংশ। আক্রান্তের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই তাকে সুস্থ করতে পারে। সেজন্য দ্রুত রোগ ধরা পড়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় নিপাহ ভাইরাসকে ‘জুনটিক ভাইরাস’ বলা হয়। অর্থাৎ পশুর শরীর থেকে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকে। আক্রান্ত পশুদের দেহের অবশিষ্টাংশ বা মলমূত্র থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। । বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস এখন আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়; বরং এটি এক ভয়াবহ ও অপ্রতিরোধ্য প্রাণঘাতী সংকটে রূপ নিয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সর্বশেষ তথ্য চমকে দেওয়ার মতো। গত দুই বছরে দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া শতভাগ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আগে যেখানে মৃত্যুহার ছিল ৭০ শতাংশের আশপাশে, এখন তা ১০০ শতাংশে পৌঁছানো মানেই হলো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার অর্থই অবধারিত মৃত্যু। এই চরম বাস্তবতার পরও খেজুরের কাঁচা রস বিক্রি ও পানের উৎসবে লাগাম না টানা প্রশাসনিক ব্যর্থতারই নামান্তর। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে পাঁচ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর এশিয়ার একাধিক দেশ তাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার মতো কড়া স্বাস্থ্যবিধি ও নজরদারি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করেছে। কোনো কার্যকর প্রতিষেধক বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় নিপাহ ভাইরাসকে ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ দ্রুত গতিতে বাড়ছে। সীমান্তের এই পাশেও প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি আদৌ প্রস্তুত? নাকি আগের মতোই ঝুঁকি জেনেও নিশ্চিন্তে থাকব, যতক্ষণ না প্রাণহানির খবর আমাদের ঘুম ভাঙায়? জনস্বাস্থ্যবিদেরা দীর্ঘকাল ধরে খেজুরের কাঁচা রস বিক্রি ও পানের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানিয়ে আসছেন। আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একমত হলেও অজ্ঞাত কারণে কঠোর কোনো আইন বা কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। যখন একটি রোগে মৃত্যুর হার শতভাগ, তখন সেখানে সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করাই যথেষ্ট নয়; বরং কাঁচা রস কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে কঠোর শাস্তির বিধান করা সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button