রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে নেই স্পষ্ট পরিকল্পনা: বিআইপি

প্রবাহ রিপোর্ট : নগর-পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, ‘ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করবে’ আমরা অনেক বছর ধরে শুনছি এবং আগে যত নির্বাচন ছিল, সে নির্বাচনগুলোতে কোনও দল যদি বলতো বিকেন্দ্রীকরণ করার জন্য- ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে অন্য জেলা ও অন্য বিভাগে আপনি এই বাকি ডিস্ট্রিবিউশনটাকে কীভাবে চিন্তা করছেন, সেই বিষয়টি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে আসেনি। গতকাল রোববার বিআইপি সম্মেলন কক্ষে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ইশতেহার পর্যালোচনা: পরিকল্পনা, নগরায়ন ও টেকসই উন্নয়ন’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দলগুলোর মধ্যে পরিবর্তন এসেছে, তারা পরিকল্পনা বিষয়গুলোকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। কারণ, অন্তত এই রাজনৈতিক দলগুলো যদি স্বীকার করে যে, দেশের পরিকল্পিত উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশকে টেকসই, বাসযোগ্য এবং ন্যায্যতাভিত্তিক যে বাংলাদেশ- এই স্বীকৃতিটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এখন এই স্বীকৃতির পাশাপাশি আরেকটা বিষয় সম্পূরক সব দলের মধ্যেই এসেছে। তারা বলছে, ঢাকার ওপর চাপ বাড়ছে, আমাদের চাপটাকে সরিয়ে বিকেন্দ্রিকরণ করতে হবে। আমি যদি স্পষ্ট করে দেখি, যেমন- বিএনপি স্যাটেলাইট সিটি উন্নয়নের কথা বলছে, জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট করে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলাকে তারা উন্নয়ন ছড়িয়ে দেবে এবং তার পাশাপাশি উপজেলাকেন্দ্রিক ৫০০টি উপজেলাকেও পরিকল্পিত সেবার অঙ্গীকার করেছেন এবং একইভাবে এনসিপিও এই কথাগুলো বলেছে। তিনি বলেন, এখন বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া অবশ্যই আমরা জানি- বাংলাদেশের কোনও সমাধান নেই। ঢাকায় যতই মেট্রোরেল মনরেল যাই করা হোক, ঢাকা বাঁচবে না এবং ঢাকা বাংলাদেশকে নিয়ে ডুববে। কারণ ঢাকায় যে পরিমাণ ইনভেস্টমেন্ট আমরা করছি, ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য- এটার একটা সম্ভাবনাময় ব্যয় আছে। কাজেই এটার যে স্বীকৃতি, এই স্বীকৃতিটাকে আমরা কী দেখতে চাই, আমরা দেখতে চাই- তাদের যে অ্যাকশন, সেই অ্যাকশনগুলোকে দেখতে চাই। কিন্তু যে জিনিসটা নাই, বিকেন্দ্রীকরণ করবে, আমরা অনেক বছর ধরে শুনছি এবং আগে যত নির্বাচন ছিল, সে নির্বাচনগুলোতে কোনও দল যদি বলতো- বিকেন্দ্রীকরণ করার জন্য আমাদের ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে অন্য জেলা, অন্য বিভাগে আপনি কীভাবে বাকি ডিস্ট্রিবিউশনটাকে চিন্তা করছেন- এটা কোথাও নাই, এগুলো লাগবে। কারণ আপনি বিকেন্দ্রিকরণ করবেন, তাহলে ঢাকায় তো আমি আগে দেখেছি- সরকার ১০০ টাকা খরচ করলে ঢাকায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ঢাকায় দিচ্ছে, চট্টগ্রামে ২০-২৫ টাকা দিচ্ছে, আর সারা বাংলাদেশের জন্য কিছু নাই। দুঃখজনক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকার এই দেড় বছর শাসন করে গেল। দেখলাম, চট্টগ্রামে প্রজেক্টের সবকিছু চলে গেল। তাহলে এই যে কোনও একটা রিজিওন বায়াস! কেন চট্টগ্রামের উপদেষ্টার সংখ্যা বেশি! এই রিজিওনাল বায়াসড যদি আপনি সরাতে চান, তার বাজেটের কোনও লিংক কিন্তু ইশতেহারে নাই। তাহলে আমরা বুঝতে পারি না যে, শুধু মুখের কথায় বিকেন্দ্রীকরণ করবো, কিন্তু সারা বাংলাদেশে এটা কীভাবে হবে। সুতরাং, এই জিনিসগুলো দরকার, তাহলে আমরা পাঁচ বছর পরে বলতে পারতাম, আপনি পাঁচ বছর আগে কমিটমেন্ট করেছিলেন যে, এই জেলাতে এই বিভাগে তার উন্নয়নের পরিকল্পনাটা কী, আলাদা পরিকল্পনা কী, সেটা আসেনি। সুতরাং, সেটা আনা দরকার ছিল। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করা লাগবে। কারণ এই যে উন্নয়নের জন্য আমরা দেখেছি- বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্ল্যানিং বলেন, ডেভেলপমেন্ট বলেন, সেটা পেশাজীবীদের বাদ দিয়ে আমলানির্ভর, প্রতিষ্ঠানগুলো আমলানির্ভর। সেই জায়গাতে কীভাবে আমলাতন্ত্রকে ঢেলে সাজাবেন- এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য। সেই জায়গাটা কিন্তু কোনও স্পষ্ট কিছু নাই। সংবাদ সম্মেলনে বিআইপিসহ সভাপতি শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমাদের পর্যালোচনা যদি আমরা বলি এখানে, তাদের যে ঘোষণাগুলো এসেছে- সেই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে যে অপরিকল্পিত নগরায়ন, এটা কীভাবে পুনর্গঠন করা যায়, রিডেভলপমেন্ট করা যায়, এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনও কর্মসূচি তারা দিতে পারে নাই। সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি’র পক্ষ থেকে ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেন বিআইপি সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। সুপারিশগুলোর মধ্যে আছে- ১) পরিকল্পিত নগরায়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা: সমগ্র দেশের স্থানিক ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কৃষিজমি সংরক্ষণ ও অনিয়ন্ত্রিত গ্রামীণ বসতি বিস্তার নিয়ন্ত্রণ, মাস্টারপ্ল্যানকে আইনগত বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা এবং জাতীয় নগরনীতি ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন। ২) বিশেষায়িত এলাকা: জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, হাওর, চর, পাহাড়ি ও দ্বীপাঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকার জন্য পৃথক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন। সব মেগা ও বিশেষ প্রকল্পের জন্য বাধ্যতামূলক পরিকল্পনা, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন অপরিহার্য করা। নদী, বন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অগ্রাধিকার দেয়া। ৩) স্তরভিত্তিক পরিকল্পনা: জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা তৈরি ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পরিকল্পিত শিল্প অঞ্চল ও ইকোনমিক জোন গড়ে তুলতে হবে। এসব শিল্পাঞ্চলে থাকবে শ্রমিকবান্ধব আবাসন, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবা। ৪) বসবাসযোগ্য ও সাশ্রয়ী আবাসন: নি¤œ ও মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন উদ্যোগ, ভাড়াভিত্তিক ও সরকারি জমিতে সামাজিক আবাসন ব্যবস্থা, বস্তি উন্নয়ন ও পুনর্বাসন এবং খোলা স্থান, পার্ক ও খেলার মাঠ সংরক্ষণ। গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য ভূমি ও অর্থের সংস্থান বাড়ানো প্রয়োজন, পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকে প্রসারিত করতে হবে। ৫) নাগরিক সেবা ও নগর সুবিধা: নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন; বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে নিরবচ্ছিন্নতা ও জবাবদিহিতা; সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নাগরিক সেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি হ্রাস। খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, বিনামূল্যে ও মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। ৬) পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল শহর: নদী, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ; বায়ু, শব্দ ও পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ; জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যা মোকাবিলায় প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ৭) গণপরিবহন ও চলাচল ব্যবস্থা: সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সমন্বিত গণপরিবহন উন্নয়ন; ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমিয়ে গণপরিবহনমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধি; পথচারী, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সার্বজনীন চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বহুমাধ্যমভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মেট্রোরেল, মনোরেল, লাইট র্যাপিড ট্রানজিট (এলআরটি), কমিউটার ট্রেনের পাশাপাশি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও উন্নত বাস-মিনিবাস সার্ভিসের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। জলপথ ও রেলপথ ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। ৮) স্থানীয় সরকার ও নগর শাসন: সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন; নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতকরণ; পরিকল্পনা ও বাজেট প্রক্রিয়ায় নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নগর শাসন প্রতিষ্ঠা। ৯) সামাজিক ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি: নগর দরিদ্র, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা; হকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের নীতিগত স্বীকৃতি; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবায় বৈষম্য কমানো এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিসর নিশ্চিত করা। কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি ও সহজ ঋণ প্রদান, খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, সবার জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। ১০) প্রমাণভিত্তিক ও পেশাদার পরিকল্পনা: নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় ভূমিকা; ডাটা, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ; রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর নগর এজেন্ডা প্রণয়ন।



