সুন্দরবনের সিন্ডিকেট ভাঙতে নতুন কৌশলে সাতক্ষীরা ফরেস্টের অভিযান

# নৌকাসহ ১২০ কেজি কাঁকড়া, ৩৬০টি নিষিদ্ধ আটন জব্দ
আনিছুর রহমান কবির ঃ একটা সময় ছিল সুন্দরবনে অভিযান মানেই আগেভাগে ঢাকঢোল পিটিয়ে অভিযানে নামা। যার ফলে অসাধু সিন্ডিকেট ও কোম্পানিগুলো আগেই জেনে যেতÍকোথায়, কখন সুন্দরবন ফরেস্ট অভিযান পরিচালনা করবে। কারণ এসব কোম্পানি ফরেস্ট বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে প্রতিটি নৌকার বিপরীতে মাসোয়ারা দিয়ে অভয়াশ্রম এলাকায় অবাধে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করত।
এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ফরেস্ট বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ফলে বিএফও, সদর এসিএফ এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জের এসিএফরা যখনই অভিযানে নামতেন, তখনই এসব অসাধু কর্মকর্তা গোপনে কোম্পানির মালিকদের খবর পৌঁছে দিত। এতে করে আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যেত অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা অভয়াশ্রম ত্যাগ করে সুন্দরবনের ছোট ছোট খালে ঢুকে পড়ত, যেখানে ফরেস্টারদের পক্ষে তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। আবার ফরেস্টাররা ফিরে গেলে তারাও পুনরায় অভয়াশ্রমে মাছ ধরা শুরু করত।
তবে সম্প্রতি ডিএফও, সদর এসিএফ ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের এসিএফের নতুন ও কৌশলগত অভিযানের ফলে সুন্দরবনের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। এখন আর আগের মতো ঢাকঢোল পিটিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয় না। এর সফলতার প্রমাণ মিলেছে গতকালের অভিযানে।
সাতক্ষীরার এসিএফ গত দুই দিন আগে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কোথায় যাবেন, কোন স্টাফ নিয়ে যাবেন, কখন যাবেনÍএমনকি আদৌ যাবেন কিনাÍএ বিষয়ে কোনো পূর্বাভাস, নোটিশ বা আভাস ছিল না সাতক্ষীরা রেঞ্জে।
সুন্দরবনের ভেতরে নেটওয়ার্ক ও খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় ফরেস্টারদের সাধারণত ২–৩ দিনের খাবার সঙ্গে নিতে হয়। এ অভিযানে কৌশল এতটাই গোপন রাখা হয় যে সাতক্ষীরা রেঞ্জের এসিএফ মো. মশিউর রহমান দুই দিন আগেই ব্যক্তিগতভাবে বাজার করে রাখেন। পরশুদিন গভীর রাতে হঠাৎ তিনি একজন বোটম্যান ও একজন গানম্যানকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে অভিযানে বের হন। ফলে এসিএফ কোথায় যাচ্ছেনÍতা কেউই জানতে পারেনি।
এরই ফলশ্রুতিতে তিনি যে নির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে অভিযানে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই তথ্য অনুযায়ী এবং নির্ধারিত স্থান থেকেই অবৈধ কাঁকড়ার নৌকা, কাঁকড়া ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পুষ্পকাঠি টহল ফাঁড়ির অধীন জলঘাটা খালে প্রবেশের আগে চরের ওপর দিয়ে হারানখালী খালের ভেতরে কাঁকড়ার নৌকা অবস্থান করছিল।
এই সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে ২টি নৌকাসহ ১২০ কেজি কাঁকড়া এবং ৩৬০টি নিষিদ্ধ আটন জব্দ করা হয়। এ সময় নৌকায় থাকা বিপুল পরিমাণ অন্যান্য সরঞ্জামও জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় আরও কয়েকটি নৌকা ও জেলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
জব্দকৃত নৌকা ও মালামাল পুষ্পকাঠি টহল ফাঁড়িতে হস্তান্তর করা হয়েছে। যেহেতু অভিযুক্তরা পালিয়ে গেছে, সেহেতু আদালতে একটি ইউজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরবর্তীতে মালিক শনাক্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের ফরেস্ট কর্মকর্তা এসিএফ মো. মশিউর রহমান বলেন, “দুই দিনের জন্য গভীর রাতে অভিযানে বের হয়েছি এবং কিছু কৌশল অবলম্বন করেছি, যার সফলতা আমরা পেয়েছি। আমরা ১২০ কেজি কাঁকড়া ও ৩৬০টি নিষিদ্ধ আটনসহ বিপুল পরিমাণ মালামাল জব্দ করেছি। এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চলবে এবং আগে থেকে আর কোনো ঘোষণা দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে না। আমরা সুন্দরবনকে অবৈধ দখলদারমুক্ত রাখতে চাই।” এ বিষয়ে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা এসিএফ মো. শামীম রেজা মিঠু বলেন, “আমরা প্রতিটি অভিযানে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছি, যাতে কোনোভাবেই সিন্ডিকেটের মধ্যে অভিযান পরিচালিত না হয়। এসব সিন্ডিকেট সদস্যদের নির্মূল করতে আরও নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে সুন্দরবনকে অবৈধ দখলদার ও সিন্ডিকেটমুক্ত করতে ফরেস্ট বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।” সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) জেড এম এ হাসান বলেন, “আগে কোথায় কী হয়েছে, সেটা ভুলে যেতে হবে। নতুন বাংলাদেশে নতুনভাবে সুন্দরবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না। অভিযান হবে নতুন কৌশলে। কোনো প্রকার দখল, চাঁদাবাজি ও বিনিময়কারীদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। সাংবাদিক ভাইদের অনুরোধ করবÍআপনারাও আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। আমরা অভিযান পরিচালনা করব এবং সুন্দরবনকে সুন্দর রাখব।” তিনি আরও বলেন, “ইতিমধ্যে অনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। সাতক্ষীরা ও খুলনাসহ সকল রেঞ্জেই এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে। সামনে আরও নতুন কার্যক্রম দেখতে পাবেন।”



