জাতীয় সংবাদ

ডিজিএফআইয়ের অফিসে আলাদা কক্ষে কার্যক্রম চালাত ‘র’

জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া

প্রবাহ রিপোর্ট : সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, তিনি সেনাপ্রধান থাকাকালে জানতে পারেন—মেজর জেনারেল (অব) তারিক সিদ্দিকীর ছত্রছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করত এবং সেখানে যে সাতটি মিটিং রুম ছিল তার একটিতে তাদেরকে কাজ করতে দেওয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তার তালিকা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিত।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জবানবন্দিতে তিনি এ কথা বলেন।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, সেনাপ্রধানের তথ্য পাওয়ার জন্য অনেক সূত্র রয়েছে। আমার অধীনে আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট এবং ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স নামে দুটি ব্যক্তি বা সংস্থা রয়েছে। এছাড়া র‌্যাবের অফিসার এবং অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে আমি অনেক তথ্য জানতে পারতাম। এসব তথ্যের মাধ্যমে জানতে পারি, সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের মিসগাইড করা হচ্ছে এবং ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনি তিনটি ঘটনা উল্লেখ করেন।
প্রথমত, একজন কনিষ্ঠ অফিসার র‌্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অফিসে আসেন। র‌্যাব থেকে যারা ফিরে আসত, তাদেরকে তিনি প্রথম প্রশ্ন করতেন—তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে? এই অফিসারকে একই প্রশ্ন করা হয়। সে উত্তরে বলল, ছয়জন। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ছয়জনকে কি সে সরাসরি হত্যা করেছে? উত্তরে সে বলল, দুইজনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চারজনকে হত্যার সময় সে সেখানে উপস্থিত ছিল। তারপর সেনাপ্রধান জিজ্ঞেস করেন, প্রতিটি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছে? উত্তরে সে বলল, ১০ হাজার। তখন জিজ্ঞাসা করা হয়, টাকা নিয়ে কী করেছো? উত্তরে সে বলল, টাকাগুলো গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে দিয়েছে। তখন ইকবাল করিম বুঝে নেন এই কাজগুলো সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছে এবং অপরাধবোধ থেকে সে টাকাগুলো মসজিদে দান করেছে।
দ্বিতীয় ঘটনাতে, একজন লে. কর্নেল তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অফিসে আসেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, কয়জনকে হত্যা করেছো? সে বলল, ছয়জন। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন করেছো? উত্তরে সে বলল, ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছি। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি তোমার ঊর্ধ্বতন অফিসার কি না? সে বলল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞাস করলাম, আমি যদি আমার হাগু তোমাকে খেতে বলি, খাবে কি না? সে বলল, না। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বলল, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। আমি তাকে বললাম, তাহলে কেন করেছো? উত্তরে সে নিশ্চুপ থেকেছে।
তৃতীয় ঘটনাতে, একজন মেজর যিনি আগে আমার সঙ্গে চাকরি করেছেন। র‌্যাবে পোস্টিং হওয়ার কিছুদিন পর তিনি আমার সঙ্গে সেনাভবনে দেখা করেন। তার আগের একটি ঘটনা আমার কর্ণপাত হওয়ার কারণে আমি তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। ঘটনাটি ছিল হোটেল রেডিসনে চাকরিরত একটি মেয়েকে কিছু দুর্বৃত্ত রাতে বাড়ি ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যা করে। সে ওই ব্যক্তিদেরকে হত্যা করে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি আইন নিজের হাতে কেন তুলে নিয়েছো? সে বলল, এই ব্যক্তিগুলো সমাজবিরোধী ব্যক্তি এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। আমি তাকে বললাম, তুমি যে আইন ভঙ্গ করে তাদেরকে হত্যা করেছো, তুমিওতো সমাজবিরোধী ব্যক্তি। সে এরপর নিশ্চুপ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমি তাকে প্রতিজ্ঞা করাই, সে র‌্যাবে আর এই ধরনের কাজ করবে না। কিন্তু হতাশার সঙ্গে দেখি কিছুদিন পর সে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে। যেখানে দেখা যায়, শাপলা চত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে এবং কর্নেল জিয়াউল একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য ইন্টারভিউয়ের মধ্যে এগুলো ছিলো অল্প কয়েকটি উদাহরণ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button