সারা দেশে ৫০ শতাংশ ভোট কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ

ভোটের লড়াইয়ে ২০২৮ প্রার্থী
মাঠে থাকছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য
প্রবাহ রিপোর্ট : দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যার মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮১ জন। নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর করতে মাঠ পর্যায়ে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
ইসি সানাউল্লাহ জানান, সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে সশরীরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোট গণনা করা হবে। সব মিলিয়ে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৫৮টি। ইন-পার্সন ভোটিংয়ের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ এবং বাকি ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ।
পোস্টাল ভোটের বিষয়ে তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারদের কাছে ৭ লাখ ৩ হাজার ব্যালট পৌঁছেছে। বাকিগুলো ট্রানজিটে রয়েছে, যা আগামী পরশুদিনের মধ্যে পৌঁছে যাবে।
সানাউল্লাহ জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এবার বিশাল বহর থাকছে। দেশীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে অ্যাক্রেডিটেশন পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন। এর মধ্যে ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক রয়েছেন, যা আরও বাড়তে পারে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যাদের মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সংবাদকর্মী।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকছে ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য। দায়িত্ব পালন করবেন ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। নিরাপত্তায় এবার যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ইউএভি (ড্রোন) এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা। এছাড়া ৯৫ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মাঠ পর্যায়ে ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার, ৯৫৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং ৫ লক্ষাধিক পোলিং অফিসার ভোটগ্রহণের কাজে নিয়োজিত থাকবেন। আগামীকাল সকাল থেকে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ শুরু হবে।
সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, এবার ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকতে পারবে। নির্বাচনের দিন প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর অগ্রগতির রিপোর্ট প্রদান করা হবে (মোট চারবার)। গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ফলাফল একই সাথে ঘোষণা করা হবে। বেশিরভাগ ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে ইসি। পরের দিন সকালে রিটার্নিং অফিসার ‘ফর্ম-১৮’ তে স্বাক্ষর করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশিত হবে।
আবুল ফজল জানান, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টিরও বেশি তদন্ত করা হয়েছে। এছাড়া ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্টচক্র সহিংসতা ঘটাতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তারই প্রমাণ।
ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি জানান, মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ছেড়ে মানুষের গ্রামে যাওয়ার ঢল দেখে ভালো ভোটার টার্নআউটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কমিশন সকল রাজনৈতিক দল ও সমর্থকদের সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে।
নির্বাচনে মাঠে থাকছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া, নির্বাচনের নিরাপত্তায় প্রথমবারের মতো ইউএভি (আনম্যান এরিয়াল ভেহিকল), ড্রোন এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরে এসব তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘আগামী পরশু (১২ ফেব্রুয়ারি) ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন হয়েছে। নির্বাচনের মাঠে ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।’
নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সানাউল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচনে ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার এবং ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটগ্রহণের মূল দায়িত্বে থাকবেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার। সর্বমোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন।’
ফলাফল ঘোষণা ও রিটার্নিং অফিসারদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ভোট গণনা শেষে কেন্দ্র থেকে একটি ফলাফল প্রকাশ হয়ে যাবে। এরপর দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় সহকারী রিটার্নিং অফিসারের স্বাক্ষরের পর সেটি রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে আসবে। কমিশনের ঘোষণা মঞ্চ থেকে তখন চূড়ান্ত ফলাফল জানানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি কেন্দ্রের আনঅফিসিয়াল ফলাফল আগে ঘোষণা করা হলেও, রিটার্নিং অফিসাররা প্রার্থী বা তাদের এজেন্টের উপস্থিতিতে তা ‘ফর্ম ১৮’-তে লিপিবদ্ধ করবেন। এর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে গেজেট প্রকাশিত হবে।’
এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রথমবারের মতো এবার ইউএভি বা ড্রোন এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় ২৫ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা মাঠে থাকবে। এর মধ্যে কিছু আইপি বেসড থাকবে, যেগুলো সরাসরি ফিড দেবে এবং কিছু লোকাল রেকর্ডিং করবে। তাছাড়া সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য ইতোমধ্যে ৯০ ভাগের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।’
তিনি জানান, ভোটগ্রহণ চলবে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। তবে বিকেল সাড়ে ৪টার পরেও কেন্দ্রের সীমানার মধ্যে ভোটার থাকলে তাদের ভোট নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে সশরীরে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছি।’
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল গণনা পদ্ধতি সম্পর্কে এই কমিশনার বলেন, ‘সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল আমরা একইসঙ্গে দিতে থাকবো। কেন্দ্রেও দুটো ব্যালট একই সাথে গণনা করা হবে। সাদা ব্যালট সংসদ নির্বাচনের এবং গোলাপি ব্যালট গণভোটের জন্য। জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর যেন এজেন্টরা চলে না যান বা বাইরে অস্থিরতা তৈরি না হয়, সেজন্য দুটোই একসঙ্গে করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘ভোটার স্লিপের আয়তন ঠিক রেখে সেখানে প্রার্থীর নাম বা প্রতীক থাকতে পারবে, এটি সংশোধিত হয়েছে। আর মোবাইল ফোনের বিষয়ে নির্দেশনা হলো, গোপন কক্ষে (মার্কিং প্লেস) ভোটারসহ কেউই মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে সাংবাদিকরা নীতিমালা মেনে পেশাগত দায়িত্ব পালনে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন, কিন্তু গোপন কক্ষে প্রবেশ বা লাইভ করতে পারবেন না।’
নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র ও অর্থের প্রভাব রোধে কমিশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত ৮৫০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া একটি ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে বিএফআইইউ-কে নজর রাখতে বলা হয়েছে।’
নির্বাচন কমিশন বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট জানিয়ে তিনি দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে উৎসবমুখরভাবে ভোটদানের আহ্বান জানান।



